টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে মুখ খুললেন মামুনুল হক

গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকায় ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মাদ্রাসা থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতার মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেম আহম্মদ (৩০) বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ঘটনাটি কেন্দ্র করে পালটাপালটি দুটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার পোস্টটি পাঠকদের জন্য হুবহু দেওয়া হলো। ‘টঙ্গীর ঘটনা, ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গন নিয়ে কিছু কথা পাঁচ দিনের সফরে মালয়েশিয়ায় আছি। বিদেশে থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত থাকছি। সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত টঙ্গী মাদ্রাসার অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা আমার কাছে যথেষ্ট উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে সংশ্লিষ্ট সব মহলের দৃষ্টি আকর্শণের জন্য কয়েকটি কথা তুলে ধরতে চাই।’ মানুষের ইজ্জত হরণ ও ধর্ষণের মতো অপরাধও অত্যন্ত গুরুতর। সন্দেহ, অনুমান কিংবা দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই দুই নীতির সমন্বয়ই ন্যায়বিচারের ভিত্তি। এজন্য হিফজের শিক্ষার্থীরা সবসময় শিক্ষকদের ব্যাপারে একটা নেতিবাচক মনোভাবের উপরে থাকত আমাদের সময়টায়। তখন আমার মনে আছে আমাদের সঙ্গে পাড়ার কিছু চঞ্চল ছেলে পেলেও পড়াশোনা করত। আমাদের উস্তাদ ছিলেন অন্ধ হাফেজ সাহেব। আমাদের সেই ছোট্ট সাত-আঠ বছর বয়সের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, কয়েকটা চঞ্চল ছেলে পরিকল্পনা করতো হুজুরকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলা যায় কিনা। অতিসম্প্রতি আমাদের শিক্ষকতার সময়কালীন এমন বেশ কয়েকটি গুরুতর ঘটনার সংবাদ আমার জানা আছে। বেশ কয়েকদিন নিরুদ্দেশ থাকার পর বাড়িতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর নাটকের স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে বসেছিল। বলেছিল তাকে নাকি কোনো কিডন্যাপার গ্রুপ কিডন্যাপ করে ট্রাকে করে পাচার করে দিচ্ছিল বর্ডারের কোনো এলাকায়। সেখান থেকে সে এক অতি মানবীয় কায়দায় সিনেমার নায়কের মতো পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছে। সে অবস্থা থেকে বাড়িতে ফেরার পর তার বাবা মা তাকে নিয়ে সে কি আদর যত্ন। অথচ পরে জানতে পেরেছি পুরো ঘটনাটাই ছিল ভুয়া। সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে ভালো সাজার জন্যে এই অপহরণ নাটক সাজিয়েছিল। তার বাবা-মাও বিষয়টি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছিল। একটা ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। ক্লাশ ফাইভে পড়ার সময় তার মাথায় এক ভয়ংকর ভূত চাপল। ছেলেটার বাবা ছিল একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তার বাবা গোটা প্রশাসনকে তোলপাড় করে ফেলেছিল। সারা দেশ জুড়ে প্রশাসনিক রেড অ্যালার্ট জারি হওয়ার মতো ব্যবস্থা জারি করেছিল। শেষতক জানা গিয়েছিল যে, ছেলেটি আসলে নিজ থেকেই এমন একটি ঘটনার অবতারণা করেছে। তারপর একটি সুন্দর নাটক সাজিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিল। আমাদের সুপরিচিত বন্ধুবর মুহতারাম মাওলানা হাসান জামিল সাহেবের দারুল উলুম রহমানিয়া মাদ্রাসা, যা এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত, সেই মাদ্রাসায় এমন এক ভয়ংকর ঘটনার কথা আমরা জানি। একটি ছোট্ট শিশু মাদ্রাসা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য রাতের বেলায় বহুতল ভবনের যেই জেনারেটর রয়েছে, সেই জেনারেটর সার্ভিসে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

মামুনুল হকের দেওয়া পর্যবেক্ষণসমূহ

  1. বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ঘটনাটি কেন্দ্র করে পালটাপালটি দুটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
  2. অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি ও প্রমাণের মানদণ্ড ইসলামসহ যেকোনো গ্রহণযোগ্য নৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো— গুরু অপরাধের গুরু শাস্তি, লঘু অপরাধের লঘু শাস্তি। গুরু অপরাধের লঘু শাস্তি যেমন ইনসাফ নয়, তেমনি লঘু অপরাধের গুরু শাস্তিও ন্যায়সংগত নয়। গুরুতর অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তি দেওয়াও যথার্থ হতে পারে না। অভিযোগ উত্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; শরিয়ত নির্ধারিত প্রমাণের শর্ত পূরণ করাও অপরিহার্য। অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, শরিয়তের নির্দিষ্ট শর্তে অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে মিথ্যা অপবাদ দানের দায় নিতে হবে।
  3. শিশুর মনস্তত্ত্ব ও অভিযোগ যাচাইয়ের গুরুত্ব আরেকটি বিষয় আমি এখানে উত্থাপন করতে চাই। বিষয়টি হলো শিশুর মনস্তত্ত্ব। শিশুদের মনে কত রকম কাল্পনিক এমনকি ভয়ংকর পরিকল্পনা ও চিন্তা কাজ করে সেটা অনেক সময় পরিস্থিতির সম্মুখীন না হলে কল্পনা করাও কঠিন। আমার মনে আছে এই জটিল বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
  4. টঙ্গীর ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আলোচিত ঘটনায় আমি নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের পক্ষাবলম্বন ছাড়াই যে কথা বলতে চাই তা হলো, মাদ্রাসা শিক্ষকের বিষয়ে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে অভিযোগটি অবশ্যই গুরুতর। সুতরাং নীতির আলোকে গুরুতর অপরাধের জন্য তার গুরুতর শাস্তি হওয়াই কাম্য।
  5. মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা পরিস্থিতি আমার কাছে খুবই বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গণের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের যে অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, তার বিপরীতে সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং শিশু নিপীড়নের যে কোনো অভিযোগ দ্রুত আমলে নিয়ে বিহিত করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
  6. সমন্বিত উদ্যোগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, দেশের আলেম সমাজ, ধর্মপ্রাণ মানুষ ও দেশপ্রেমিক সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ একযোগে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে অনিবার্য সংঘাতের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যাবে না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বলয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
  7. আবারো তৎপর হলুদ মিডিয়া চিহ্নিত মিডিয়া সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে সেই ফ্যাসিবাদী আমলের সবচেয়ে বড় অত্যাচারের হাতিয়ার ফ্যাসিবাদী মিডিয়াগুলো এই বিষয়ে আবার তৎপর।
  8. রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব এখানে রাজনীতির খেলা হচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ ইসলামপন্থি যে সব সংগঠন সরকারদলের সঙ্গে জোটবদ্ধ আছে তাদের উচিত এই বিষয়ে বিএনপি নেতাদেরকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। আমি জানি না টঙ্গির ঘটনায় সরকার সংশ্লিষ্টরা কী করে মাদ্রাসায় শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখছেন।
  9. প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধর্মীয় অঙ্গনের সাখাগত বিভেদ ভুলে সকলের ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় ভূমিকা রাখা দরকার। অন্যথায় মাশুল সবাইকেই গুণতে হবে। শেষ কথা হলো— শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে, প্রকৃত অপরাধীর কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরপরাধ কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে মুখ খুললেন মামুনুল হক

আপলোডের সময় : 12:10:10 pm, Monday, 26 October 2026

গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকায় ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মাদ্রাসা থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতার মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেম আহম্মদ (৩০) বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ঘটনাটি কেন্দ্র করে পালটাপালটি দুটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার পোস্টটি পাঠকদের জন্য হুবহু দেওয়া হলো। ‘টঙ্গীর ঘটনা, ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গন নিয়ে কিছু কথা পাঁচ দিনের সফরে মালয়েশিয়ায় আছি। বিদেশে থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত থাকছি। সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত টঙ্গী মাদ্রাসার অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা আমার কাছে যথেষ্ট উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে সংশ্লিষ্ট সব মহলের দৃষ্টি আকর্শণের জন্য কয়েকটি কথা তুলে ধরতে চাই।’ মানুষের ইজ্জত হরণ ও ধর্ষণের মতো অপরাধও অত্যন্ত গুরুতর। সন্দেহ, অনুমান কিংবা দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই দুই নীতির সমন্বয়ই ন্যায়বিচারের ভিত্তি। এজন্য হিফজের শিক্ষার্থীরা সবসময় শিক্ষকদের ব্যাপারে একটা নেতিবাচক মনোভাবের উপরে থাকত আমাদের সময়টায়। তখন আমার মনে আছে আমাদের সঙ্গে পাড়ার কিছু চঞ্চল ছেলে পেলেও পড়াশোনা করত। আমাদের উস্তাদ ছিলেন অন্ধ হাফেজ সাহেব। আমাদের সেই ছোট্ট সাত-আঠ বছর বয়সের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, কয়েকটা চঞ্চল ছেলে পরিকল্পনা করতো হুজুরকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলা যায় কিনা। অতিসম্প্রতি আমাদের শিক্ষকতার সময়কালীন এমন বেশ কয়েকটি গুরুতর ঘটনার সংবাদ আমার জানা আছে। বেশ কয়েকদিন নিরুদ্দেশ থাকার পর বাড়িতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর নাটকের স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে বসেছিল। বলেছিল তাকে নাকি কোনো কিডন্যাপার গ্রুপ কিডন্যাপ করে ট্রাকে করে পাচার করে দিচ্ছিল বর্ডারের কোনো এলাকায়। সেখান থেকে সে এক অতি মানবীয় কায়দায় সিনেমার নায়কের মতো পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছে। সে অবস্থা থেকে বাড়িতে ফেরার পর তার বাবা মা তাকে নিয়ে সে কি আদর যত্ন। অথচ পরে জানতে পেরেছি পুরো ঘটনাটাই ছিল ভুয়া। সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে ভালো সাজার জন্যে এই অপহরণ নাটক সাজিয়েছিল। তার বাবা-মাও বিষয়টি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছিল। একটা ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। ক্লাশ ফাইভে পড়ার সময় তার মাথায় এক ভয়ংকর ভূত চাপল। ছেলেটার বাবা ছিল একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তার বাবা গোটা প্রশাসনকে তোলপাড় করে ফেলেছিল। সারা দেশ জুড়ে প্রশাসনিক রেড অ্যালার্ট জারি হওয়ার মতো ব্যবস্থা জারি করেছিল। শেষতক জানা গিয়েছিল যে, ছেলেটি আসলে নিজ থেকেই এমন একটি ঘটনার অবতারণা করেছে। তারপর একটি সুন্দর নাটক সাজিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিল। আমাদের সুপরিচিত বন্ধুবর মুহতারাম মাওলানা হাসান জামিল সাহেবের দারুল উলুম রহমানিয়া মাদ্রাসা, যা এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত, সেই মাদ্রাসায় এমন এক ভয়ংকর ঘটনার কথা আমরা জানি। একটি ছোট্ট শিশু মাদ্রাসা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য রাতের বেলায় বহুতল ভবনের যেই জেনারেটর রয়েছে, সেই জেনারেটর সার্ভিসে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

মামুনুল হকের দেওয়া পর্যবেক্ষণসমূহ

  1. বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ঘটনাটি কেন্দ্র করে পালটাপালটি দুটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
  2. অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি ও প্রমাণের মানদণ্ড ইসলামসহ যেকোনো গ্রহণযোগ্য নৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো— গুরু অপরাধের গুরু শাস্তি, লঘু অপরাধের লঘু শাস্তি। গুরু অপরাধের লঘু শাস্তি যেমন ইনসাফ নয়, তেমনি লঘু অপরাধের গুরু শাস্তিও ন্যায়সংগত নয়। গুরুতর অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তি দেওয়াও যথার্থ হতে পারে না। অভিযোগ উত্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; শরিয়ত নির্ধারিত প্রমাণের শর্ত পূরণ করাও অপরিহার্য। অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, শরিয়তের নির্দিষ্ট শর্তে অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে মিথ্যা অপবাদ দানের দায় নিতে হবে।
  3. শিশুর মনস্তত্ত্ব ও অভিযোগ যাচাইয়ের গুরুত্ব আরেকটি বিষয় আমি এখানে উত্থাপন করতে চাই। বিষয়টি হলো শিশুর মনস্তত্ত্ব। শিশুদের মনে কত রকম কাল্পনিক এমনকি ভয়ংকর পরিকল্পনা ও চিন্তা কাজ করে সেটা অনেক সময় পরিস্থিতির সম্মুখীন না হলে কল্পনা করাও কঠিন। আমার মনে আছে এই জটিল বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
  4. টঙ্গীর ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আলোচিত ঘটনায় আমি নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের পক্ষাবলম্বন ছাড়াই যে কথা বলতে চাই তা হলো, মাদ্রাসা শিক্ষকের বিষয়ে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে অভিযোগটি অবশ্যই গুরুতর। সুতরাং নীতির আলোকে গুরুতর অপরাধের জন্য তার গুরুতর শাস্তি হওয়াই কাম্য।
  5. মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা পরিস্থিতি আমার কাছে খুবই বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গণের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের যে অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, তার বিপরীতে সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং শিশু নিপীড়নের যে কোনো অভিযোগ দ্রুত আমলে নিয়ে বিহিত করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
  6. সমন্বিত উদ্যোগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, দেশের আলেম সমাজ, ধর্মপ্রাণ মানুষ ও দেশপ্রেমিক সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ একযোগে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে অনিবার্য সংঘাতের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যাবে না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বলয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
  7. আবারো তৎপর হলুদ মিডিয়া চিহ্নিত মিডিয়া সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে সেই ফ্যাসিবাদী আমলের সবচেয়ে বড় অত্যাচারের হাতিয়ার ফ্যাসিবাদী মিডিয়াগুলো এই বিষয়ে আবার তৎপর।
  8. রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব এখানে রাজনীতির খেলা হচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ ইসলামপন্থি যে সব সংগঠন সরকারদলের সঙ্গে জোটবদ্ধ আছে তাদের উচিত এই বিষয়ে বিএনপি নেতাদেরকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। আমি জানি না টঙ্গির ঘটনায় সরকার সংশ্লিষ্টরা কী করে মাদ্রাসায় শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখছেন।
  9. প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধর্মীয় অঙ্গনের সাখাগত বিভেদ ভুলে সকলের ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় ভূমিকা রাখা দরকার। অন্যথায় মাশুল সবাইকেই গুণতে হবে। শেষ কথা হলো— শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে, প্রকৃত অপরাধীর কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরপরাধ কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।