গাজা যুদ্ধ ও মোদি: ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ

বিশ্বের অনেক দেশ যখন গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের জেরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ ও ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়, তখন ভারত স্মোতরিচকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। এই সফরে তিনি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরসহ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ঘুরে দেখেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও নরওয়ে আগেই তাদের দেশে ইসরায়েলের উগ্র ইহুদিবাদী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্মোতরিচ ও তাঁর চরম ডানপন্থী সহকর্মী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে জোটগতভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। সেই মাসের শেষ দিকে ইইউ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাও দেয়। ঠিক ওই সময় ভারত স্মোতরিচকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়। তাঁর জন্য কয়েকটি শহর সফরের আয়োজন করে। মুম্বাইয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ ঘুরে দেখেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করেন। সে সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। এমন প্রতিকূল সময়ে মোদির এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু মোদিকে ‘ইসরায়েলের মহান বন্ধু’ ও ‘ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে গিয়ে একটি নতুন বিনিয়োগকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ইসরায়েল তখন গাজায় জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছিল।

গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত তিন বছরে ইসরায়েলি আগ্রাসনে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। অর্থাৎ, যুদ্ধের আগের জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যা প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজনের সমান।

ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ১৯৯২ সালে শুরু হলেও ১৯৭০-এর দশক থেকেই দেশ দুটির মধ্যে গোপন বোঝাপড়া ছিল। ২০১৪ সালে মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক নতুন গতি পায়। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, বিজেপি সরকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের চেয়ে ইসরায়েলকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা বেশি লাভজনক মনে করে। মোদি প্রায়ই ইসরায়েলি হামলার ঘটনাগুলোকে ইসলামি উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলে, তবে বাস্তবে তাদের কার্যক্রম ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরে। আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় সংঘাত চলাকালেও ভারত ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। মোদির আমলে ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদ্বীপ সুরি মনে করেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, ভারত ও ইসরায়েলের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত মিল এতটাই গভীর যে, ইসরায়েলের কোনো পদক্ষেপেরই কঠোর সমালোচনা করতে দিল্লি আগ্রহী নয়। এমনকি অবৈধ বসতি স্থাপন বা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার বিষয়েও ভারত মৃদু প্রতিক্রিয়ার বাইরে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থান অনেক বেশি বাস্তববাদী ও গোঁড়া হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা সত্ত্বেও মোদির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য অমলিন রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী ভারত আজ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ইসরায়েল-ভারত সম্পর্ককে একটি শক্তিশালী মেরুতে দাঁড় করিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

​বগুড়ার নন্দীগ্রামে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় গৃহবধূসহ নিহত ২

Verified by MonsterInsights

গাজা যুদ্ধ ও মোদি: ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ

আপলোডের সময় : 11:02:17 am, Friday, 9 October 2026

বিশ্বের অনেক দেশ যখন গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের জেরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ ও ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়, তখন ভারত স্মোতরিচকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। এই সফরে তিনি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরসহ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ঘুরে দেখেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও নরওয়ে আগেই তাদের দেশে ইসরায়েলের উগ্র ইহুদিবাদী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্মোতরিচ ও তাঁর চরম ডানপন্থী সহকর্মী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে জোটগতভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। সেই মাসের শেষ দিকে ইইউ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাও দেয়। ঠিক ওই সময় ভারত স্মোতরিচকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়। তাঁর জন্য কয়েকটি শহর সফরের আয়োজন করে। মুম্বাইয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ ঘুরে দেখেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করেন। সে সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। এমন প্রতিকূল সময়ে মোদির এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু মোদিকে ‘ইসরায়েলের মহান বন্ধু’ ও ‘ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে গিয়ে একটি নতুন বিনিয়োগকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ইসরায়েল তখন গাজায় জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছিল।

গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত তিন বছরে ইসরায়েলি আগ্রাসনে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। অর্থাৎ, যুদ্ধের আগের জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যা প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজনের সমান।

ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ১৯৯২ সালে শুরু হলেও ১৯৭০-এর দশক থেকেই দেশ দুটির মধ্যে গোপন বোঝাপড়া ছিল। ২০১৪ সালে মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক নতুন গতি পায়। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, বিজেপি সরকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের চেয়ে ইসরায়েলকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা বেশি লাভজনক মনে করে। মোদি প্রায়ই ইসরায়েলি হামলার ঘটনাগুলোকে ইসলামি উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলে, তবে বাস্তবে তাদের কার্যক্রম ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরে। আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় সংঘাত চলাকালেও ভারত ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। মোদির আমলে ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদ্বীপ সুরি মনে করেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, ভারত ও ইসরায়েলের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত মিল এতটাই গভীর যে, ইসরায়েলের কোনো পদক্ষেপেরই কঠোর সমালোচনা করতে দিল্লি আগ্রহী নয়। এমনকি অবৈধ বসতি স্থাপন বা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার বিষয়েও ভারত মৃদু প্রতিক্রিয়ার বাইরে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থান অনেক বেশি বাস্তববাদী ও গোঁড়া হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা সত্ত্বেও মোদির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য অমলিন রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী ভারত আজ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ইসরায়েল-ভারত সম্পর্ককে একটি শক্তিশালী মেরুতে দাঁড় করিয়েছে।