
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচনার খুব কাছে পৌঁছে গেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক সিটির মেয়র নির্বাচনে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নাটকীয় মোড় শেষে এখন তিনি বর্তমান মেয়রের চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। এই অগ্রগতি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একসময় শিল্পকারখানানির্ভর অভিবাসী শহর হিসেবে পরিচিত হ্যামট্রামিক আজ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বসতি। হ্যামট্রামিক এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আমের গালিব শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি হ্যামট্রামিক সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় এক বছর আগে, যখন ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনে বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির কাছে মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন মুহিত মাহমুদ। তবে নির্বাচনের পরের দিনই নগরীর ক্লার্কের কার্যালয়ে ৩৭টি ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট খুঁজে পাওয়া যায়, যা মূল গণনার বাইরে ছিল। এই ব্যালটগুলোর বৈধতা নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও হস্তান্তরসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাকি দুটি ব্যালট অন্যভাবে হিসাবভুক্ত হয়। মার্কিন গণমাধ্যম ডব্লিউডিইটি ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগেই মুহিত মাহমুদের প্রার্থিতাকে এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছিল। তাঁর আইনজীবী নাবিহ আয়াদ জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আইনি আপত্তি অব্যাহত থাকবে।
মুহিত মাহমুদ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিজের জয়ের দাবির সপক্ষে আদালতের দ্বারস্থ হন। মামলাটি বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে চলতি বছরের মার্চ মাসে মিশিগান কোর্ট অব আপিল-এ পৌঁছায়। আপিল আদালত আগের রায়ের কিছু অংশ বাতিল করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে পাঠিয়ে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টের বিচারক ক্যাথলিন ম্যাকার্থি বিতর্কিত সেই ৩৭টি ব্যালট গণনার আদেশ প্রদান করেন।
আদালতের নির্দেশে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্স বিতর্কিত ব্যালটগুলো পুনরায় গণনা সম্পন্ন করে। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত মাহমুদ পেয়েছেন ২৯টি ভোট এবং অ্যাডাম আলহারবি পেয়েছেন ৬টি। এর ফলে সামগ্রিক ভোটের হিসাবে মুহিত মাহমুদ বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে গেছেন। অনানুষ্ঠানিক এই ফলাফলে মুহিত মাহমুদ মোট ২ হাজার ৮৯ ভোট পেয়েছেন, আর অ্যাডাম আলহারবির মোট ভোট দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭-এ। ভোট পুনর্গণনার পরও ওই ব্যবধান বহাল থাকায় আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এ কারণে ওয়েইন কাউন্টির নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে ব্যালটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত করেননি। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত পান ২৯ ভোট এবং আলহারবি পান ৬ ভোট।
তবে নির্বাচনের এই ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা সম্ভব নয়। আগামী ২২ অক্টোবর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে মুহিত মাহমুদের আবাসিক যোগ্যতা সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ না আসা পর্যন্ত নির্বাচনী ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা যাবে না। মুহিত মাহমুদ শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে, তিনি হ্যামট্রামিক শহরের একজন বৈধ বাসিন্দা এবং মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার মতো সকল আইনগত যোগ্যতা তাঁর রয়েছে।
এই ঘটনাটি কেবল মুহিত মাহমুদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, বরং আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় যদি মুহিত মাহমুদের অনুকূলে আসে, তবে তিনি হবেন হ্যামট্রামিকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সঠিক গণনা নিশ্চিত করার এই লড়াই এখন স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ অর্জন কেবল একজন প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও যুক্ত করবে নতুন অধ্যায়। ডেট্রয়েট নগরীর ভেতরে অবস্থিত ছোট এই শহরে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্ম যেখানে জীবিকা ও পরিবার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেশি মনোযোগী ছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা নগর প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্বেও এগিয়ে এসেছেন। একই সময়ে নগর পরিষদেও মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে মিশিগানে আসার পর তিনি পড়াশোনা, কর্মজীবন ও কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি এমজিএম গ্র্যান্ড ক্যাসিনোতে কাজ করেছেন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সম্পত্তিকর, পানির বিল এবং নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। প্রয়োজনে পুনর্গণনাসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 
























