
ইরানকে ঘিরে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অস্থিরতার মধ্যেই চীন সফর করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ও মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই দুই দিনের সফরটি বেইজিং ও দোহা উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। চীনা কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি মঙ্গলবার দোহায় সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন অনিশ্চিত অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই অস্থিরতা আঞ্চলিক দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। সংকট নিরসনে কাতার চীনসহ অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ ও ধারণা নিয়ে কাজ করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীন এবং অন্যতম প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার—উভয়ের জন্যই হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিশ্বে মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও কাতার চীনকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
গত বছর চীন ও কাতারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন ডলার বা ২৩৮০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা দেশটিকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। এছাড়া কাতারএনার্জি চীনের সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে ২৭ বছরের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং নর্থ ফিল্ড গ্যাস সম্প্রসারণ প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশীদার করেছে।
ইরান ইস্যুতে দুই দেশের কৌশলে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য অভিন্ন। চীন সংঘাতের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে এবং তেহরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সামরিক শক্তির পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, কাতার প্রকাশ্যে তেহরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সংলাপের পথ খোলা রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
কাতারের জন্য চীনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তেহরানের ওপর চীনের নিজস্ব প্রভাব রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট নিরসনে কাতারের প্রচেষ্টায় চীনকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে পারলে দোহা কূটনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থান পাবে। তবে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে। কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সামরিক কেন্দ্র।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে না। গবেষক জোন আহমেদ খানের মতে, চীন বর্তমানে এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে বহুমুখী বিকল্প খুঁজছে। তবে ইরানের আইআরজিসির ওপর চাপ প্রয়োগে চীনের খুব একটা আগ্রহ দেখা যায়নি।
সফরে শুধু ইরান নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আল থানিও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক যুদ্ধ ও অস্থিরতা চীন-কাতার সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করার প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে, যেখানে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনীতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে চীন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনও দোহাকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে কাতার চীনকে জানিয়েছে, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরান প্রশ্নে একই স্বার্থ, ভিন্ন কৌশল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীন বারবার কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘটনায় বেইজিং সরাসরি তেহরানের সমালোচনা থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে।
প্রতিনিধির নাম 

























