সৌদি-হুতি সংঘাতের রূপ: পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত ইয়েমেন সীমান্ত

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত এক ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বৃদ্ধির ফলে লোহিত সাগর উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে সৌদি আরবের জ্বালানি ও তেল রপ্তানি খাত ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতির মাধ্যমে দাবি করেছেন যে, সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরায় অবস্থিত সামরিক ঘাঁটির কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল রুম ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে তারা বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছেন। নিখুঁত লক্ষ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এই আক্রমণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। একই সময়ে সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলের আল-তুওয়াল গভর্নরেটে হুতিদের গোলার আঘাতে একজন মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুজন আহত হয়েছেন। সৌদি সিভিল ডিফেন্স এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

হুতিদের এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি আরবের এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের সাদা, মারিব, হোদাইদাহ, তাইজ, হাজ্জাহ, আল-জাওফ ও আমরাণ প্রদেশে অন্তত ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা পরিচালনা করা হয়েছে খামিস মুশাইত ও তায়েফ বিমানঘাঁটি থেকে। এর জবাবে হুতিরা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের জনগণের ওপর চালানো এই আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার পেছনে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি হুতিরা মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগরের পুরো উপকূলরেখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল করে নিয়েছে, যা তাদের সৌদি জাহাজের ওপর হামলা চালানোর বাড়তি সক্ষমতা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধের সময় যেভাবে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইসরাইলের হাইফা ও এইলাত বন্দরকে অচল করা হয়েছিল, হুতিরা ঠিক একইভাবে সৌদি আরবের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করার কৌশল নিয়েছে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রায় চার বছর ধরে চলমান আপেক্ষিক শান্তি ভঙ্গ হয়ে গত জুলাই থেকে এই সংঘাত পুনরায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে পাঁচ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ‘বাশা রিপোর্ট’-এর প্রধান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, হুতি যোদ্ধারা পাহাড়ি এলাকা ও চোরাগোপ্তা হামলার মতো সুসংহত রণকৌশল ব্যবহার করে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তার মতে, ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সুসংহত নেতৃত্বের অভাব হুতিদের এ অগ্রগতির বড় কারণ। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেন এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

সৌদি-হুতি সংঘাতের রূপ: পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত ইয়েমেন সীমান্ত

আপলোডের সময় : 10:33:42 am, Sunday, 13 September 2026

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত এক ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বৃদ্ধির ফলে লোহিত সাগর উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে সৌদি আরবের জ্বালানি ও তেল রপ্তানি খাত ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতির মাধ্যমে দাবি করেছেন যে, সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরায় অবস্থিত সামরিক ঘাঁটির কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল রুম ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে তারা বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছেন। নিখুঁত লক্ষ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এই আক্রমণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। একই সময়ে সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলের আল-তুওয়াল গভর্নরেটে হুতিদের গোলার আঘাতে একজন মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুজন আহত হয়েছেন। সৌদি সিভিল ডিফেন্স এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

হুতিদের এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি আরবের এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের সাদা, মারিব, হোদাইদাহ, তাইজ, হাজ্জাহ, আল-জাওফ ও আমরাণ প্রদেশে অন্তত ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা পরিচালনা করা হয়েছে খামিস মুশাইত ও তায়েফ বিমানঘাঁটি থেকে। এর জবাবে হুতিরা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের জনগণের ওপর চালানো এই আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার পেছনে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি হুতিরা মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগরের পুরো উপকূলরেখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল করে নিয়েছে, যা তাদের সৌদি জাহাজের ওপর হামলা চালানোর বাড়তি সক্ষমতা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধের সময় যেভাবে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইসরাইলের হাইফা ও এইলাত বন্দরকে অচল করা হয়েছিল, হুতিরা ঠিক একইভাবে সৌদি আরবের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করার কৌশল নিয়েছে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রায় চার বছর ধরে চলমান আপেক্ষিক শান্তি ভঙ্গ হয়ে গত জুলাই থেকে এই সংঘাত পুনরায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে পাঁচ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ‘বাশা রিপোর্ট’-এর প্রধান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, হুতি যোদ্ধারা পাহাড়ি এলাকা ও চোরাগোপ্তা হামলার মতো সুসংহত রণকৌশল ব্যবহার করে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তার মতে, ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সুসংহত নেতৃত্বের অভাব হুতিদের এ অগ্রগতির বড় কারণ। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেন এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।