
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং দেশটির সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে, যার বিপরীতে সরকারি বাহিনী তাদের অবস্থান রক্ষায় বিমান হামলাসহ পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মারিব অঞ্চল, যা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এটি কেবল একটি সামরিক দুর্গ নয়, বরং দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্র। বিশ্লেষকদের মতে, মারিবের পতন ঘটাতে পারলে হুতিরা সামরিক শক্তির বড় প্রমাণ দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি সম্পদ ও রাজস্বের একটি বড় উৎসের নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে।
ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি জানান, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হুতিরা মারিবের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এটি হাতছাড়া হওয়া সরকারি বাহিনীর জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এমনকি ‘নিউ আমেরিকা’র ফিউচার সিকিউরিটি প্রোগ্রামের ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের মতে, মারিবের নিয়ন্ত্রণ হারানো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের জন্য এক চরম পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে। ভৌগোলিক বিচারেও মারিব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উত্তর ইয়েমেন থেকে দক্ষিণের শাবওয়া এবং আল-মাহরা প্রদেশের সংযোগকারী প্রধান সড়কপথ।
মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতির উপকূলে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া মারিব শহরেও ২০১৪ সালের পর থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুল সংখ্যক মানুষ অবস্থান করছেন, যারা এখন যুদ্ধের নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
ইয়েমেনি মানবাধিকারকর্মী ও লেখক নাবিল হেতারির মতে, মারিবের জয় হুতিদের জন্য বড় ধরনের প্রপাগান্ডা বা প্রচারণার হাতিয়ার হবে। এছাড়া লড়াইয়ের ভবিষ্যতের ওপর এর প্রভাব অপরিসীম। ইতিমধ্যে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী সোমবার একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, এতে হুতিদের বিভিন্ন অবস্থান ও যানবাহন লক্ষ্য করে চালানো বোমা হামলার দৃশ্য রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তাইজ নগরীতেও তুমুল যুদ্ধ চলছে। এই অঞ্চলটি হুতি নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চল, সরকারের দখলে থাকা দক্ষিণাঞ্চল এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত। তাইজ মূলত প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে হুতিরা তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকা দখল করে নিলে সৌদি সমর্থিত বাহিনী তা উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
সংকটের গভীরতা কেবল স্থলপথেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। তাইজের উপকূলবর্তী মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগরের বড় একটি অংশ হুতিরা কব্জায় নিয়েছে। এই উপকূলীয় অঞ্চলটি বাব আল-মানদেব প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই পথ দিয়েই বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পরিচালিত হয়।
বিশ্লেষক ফুয়াদ মুসেদ মনে করেন, বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিরা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। তারা মূলত হরমুজ প্রণালির আদলে এখানেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়, যাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর তেহরানের কৌশলে প্রভাব বিস্তার করা যায়। এই নিয়ন্ত্রণ সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ তারা লোহিত সাগরের নৌপথ ব্যবহার করেই নিজেদের তেল রপ্তানি করে থাকে। গত সপ্তাহে ময়ুন দ্বীপ দখলের পর হুতিরা এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকিও দিয়েছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সীমান্ত এলাকায়ও। সম্প্রতি সৌদি আরবের তিনটি শহরে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে মারিব ও তাইজে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা একদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সরকারকে কোণঠাসা করেছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তির জন্য বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্লেষকেরা বলছেন, হুতিরা যদি মারিব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে লড়াইয়ের গতিপথ চূড়ান্তভাবে তাদের পক্ষে ঘুরে যেতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুপক্ষের এ সংঘাতে আটকা পড়েছে কয়েক হাজার বেসামরিক লোক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশটির সবচেয়ে বড় গ্যাস ও তেলক্ষেত্রগুলো মারিব অঞ্চলেই অবস্থিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে যে পক্ষ এর নিয়ন্ত্রণ নেবে, তারা ইয়েমেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর একাংশ এবং সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মারিবে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে না পড়লে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা লড়াই চালিয়েই যাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিরা যদি মারিবের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে কোনো মধ্যস্থতার উদ্যোগে নিজেদের পক্ষে সুবিধাজনক শর্ত আদায়ে আলোচনায় বড় ধরনের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা গোষ্ঠীটির হাতে চলে আসতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতি–সৌদির সংঘাতে ট্রাম্প কি নতুন বিপদে পড়ছেন।
প্রতিনিধির নাম 

























