
লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যকার নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় অঙ্গনেই গভীর প্রভাব ফেলেছে। জরিপ সংস্থা ডেটাফোলহার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলার সম্ভাব্য ভোট প্রাপ্তির হার ৩৯ শতাংশ, আর লিবারেল পার্টির প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ৩৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তার খুব কাছেই অবস্থান করছেন। এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এখন কেবল ঘরোয়া সংকট বা অর্থনৈতিক ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ফিলিস্তিনের মতো একটি সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
আর্জেন্টিনার জাভিয়ের মিলেই, চিলির হোসে অ্যান্টোনিও কাস্টসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী সরকারের উত্থান এবং ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির মতো নাটকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্রাজিল বিশ্বমঞ্চে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে, তা ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় দুই প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বিপরীত। ফ্লাভিও বলসোনারো ঘোষণা দিয়েছেন যে, জয়ী হলে তিনি ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন। এমনকি ২০২৭ সালের মধ্যে তেল আবিব থেকে ব্রাজিলের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে লুলা দা সিলভা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথাগত নীতিতে অটল রয়েছেন। তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে সমর্থন জানায়।
ব্রাজিলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সিসকো রেজেক মিডল ইস্ট মনিটরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাম ও ডানপন্থী শিবিরের আদর্শিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ফিলিস্তিন প্রশ্নটি সবচেয়ে নাটকীয় ও সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রেজেক বলেন, ব্রাজিলের প্রথাগত পররাষ্ট্রনীতি ছিল স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি এর্নেস্তো আরাউজোর সময়কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইতিহাসের ‘চরম লজ্জাজনক অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যদিও পরে বলসোনারো কার্লোস ফ্রাঙ্কার মতো পেশাদার কূটনীতিককে নিয়োগ দিয়ে সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
ট্রাম্প ও মিলেইয়ের মতো নেতাদের সমালোচনা করে রেজেক বলেন, তারা পরোক্ষভাবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। ফ্লাভিও বলসোনারোর একটি পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি, যেখানে জয়ী হলে ব্রাজিলিয়ান ইসরায়েলি কনফেডারেশনের প্রধানকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। রেজেকের মতে, এটি চিকিৎসা সেবার চেয়ে সংগঠিত জায়নবাদী লবিকে তুষ্ট করার প্রয়াস মাত্র।
গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম ‘ঘৃণ্য গণহত্যা’ বলে অভিহিত করে রেজেক ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, পশ্চিমা বিশ্ব নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যার প্রভাব লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদী যে, চরম ডানপন্থী কোনো শক্তি ক্ষমতায় এলেও ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ও সংযম বজায় রাখার সক্ষমতা থাকবে। এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে ব্রাজিল কি তার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখবে, নাকি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও ঘরোয়া নানা সংকট ব্রাজিলীয় ভোটারদের মূল চিন্তার বিষয়, তবুও ব্রাসিলিয়া থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক ইস্যু আচমকাই এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে চিলি কিংবা কলম্বিয়া—সমগ্র অঞ্চলে ডানপন্থার এক শক্তিশালী পুনরুত্থান ঘটেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনের লাতিন আমেরিকা দখলের নীরব মিশন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই ফিলিস্তিন ইস্যুটি ব্রাজিলের নির্বাচনে এখন আর কেবল কোনো দূরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; ব্রাজিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেমন ভূমিকা পালন করতে চায়, সেই বৃহৎ বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে এটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্য দিকে রয়েছে উগ্র ডানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, যা ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অক্ষের কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং কয়েক দশক ধরে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রককে পরিচালিত করা মৌলিক নীতিগুলোকে পুনর্গঠন করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় দিক থেকেই লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সীমান্ত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রাজিলের এই পরবর্তী নির্বাচন শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করবে না; এটি এটাও ঠিক করে দেবে যে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশ ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কীভাবে কথা বলবে।
প্রতিনিধির নাম 

























