
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই এখন আর কোনো বেড খালি নেই। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা হাসপাতালের বারান্দায় জায়গা না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরছেন, আবার অনেকে আইসিইউতে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়লেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের মশক নিধন কার্যক্রম কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডেঙ্গু জ্বরে কাঁপছে চট্টগ্রাম নগরী। শত চেষ্টা করেও হাসপাতালের বারান্দা কিংবা ভেতরে বেড মিলছে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঘরেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। কয়েক দিনের যুদ্ধ শেষে জীবনের কাছে হার মানতে হচ্ছে জ্বরে আক্রান্তদের। বর্তমানে আক্রান্তের দিক থেকে শহর এলাকা গ্রামকে ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় ডেঙ্গু নিধনে চসিক ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের ওপর আস্থা তলানিতে ঠেকেছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের হার ৫৫.৯৫ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের প্রথম ৯ মাসে ২ হাজার ৫১৫ জন আক্রান্ত হলেও, ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯২২ জনে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত ছিল ৯৩৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪ জনের, সেখানে চলতি সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৬ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১৩ জন। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে ২২৫ শতাংশ।
হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৪ জনসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। নতুন রোগী ভর্তিতে অনীহা দেখাচ্ছে অনেক হাসপাতাল। মা ও শিশু হাসপাতালের ভুক্তভোগী অভিভাবক ইশতিয়াক আহমেদ মেহেরাজ জানান, হালিশহর এলাকাটি এখন ডেঙ্গুর হটস্পট, কিন্তু সেখানে কার্যকর কোনো ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। তার চার বছরের সন্তানের জ্বর ২০ দিন ধরে না কমায় চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে শিশু, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধদের নামও।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত ফগিং ও স্প্রে করা হচ্ছে না। আকবরশাহ এলাকার হোসনে আরা বেগম জানান, তার পুত্রবধূ আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দুইবার আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও বাসিন্দাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। রেজাউল রাজু নামক এক বাসিন্দা জানান, ক্রাশ প্রোগ্রামের নামে লোকদেখানো প্রচার চলছে, বাস্তবে মশার উপদ্রব বিন্দুমাত্র কমছে না।
ডেঙ্গু কেড়ে নিচ্ছে অনেক প্রাণ। আল আমিন নামে এক ব্যক্তি জানান, তার স্ত্রী মনি আক্তার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। চিকিৎসার বিল বাবদ ১ লাখ ২১ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। এখন তাদের আট বছর বয়সি ছেলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এছাড়া জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ডে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। গত ১০ দিনে সীতাকুণ্ডে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫ বছর বয়সী শিশু সিরাজুল মুনিরা ও ১৬ বছরের কিশোর কোরবান আলী রিফাত রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী জানান, তাদের ১৫৮টি স্প্রে মেশিন ও ৮৬টি ফগার মেশিন দিয়ে কাজ চলছে। ৬০ জনের একটি বিশেষায়িত টিম মাঠে রয়েছে। সদ্য বদলি হওয়া প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, ৪১টি ওয়ার্ডের বিশাল এলাকায় কাজ করতে গেলে কিছু ঘাটতি থেকে যায়। তবে তাদের দাবি, ব্যবহৃত বিটিআই ওষুধ আগের চেয়ে ভালো ফল দিচ্ছে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান থাকবে। তা ছাড়া ওষুধ প্রয়োগের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় জোর দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, তারা চসিকের সাথে ওষুধের মান ও সরবরাহ নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম থাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসের ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রধান অধ্যাপক মামুনুর রশীদ ডেঙ্গু বাড়ার তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন: থেমে থেমে বৃষ্টি, বর্তমান তাপমাত্রা এবং বাতাসে ৮০ শতাংশের ওপরে আর্দ্রতা। তার মতে, বৃষ্টির পানিতে জমা ডিম থেকে মাত্র তিন দিনেই এডিস মশা পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করছে। এছাড়া বর্তমানে দেশে চার ধরনের ডেঙ্গুর সংক্রামক ভাইরাস সক্রিয় রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের ডেঙ্গুর ধরন শনাক্ত করার জন্য নমুনা দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রতিনিধির নাম 

























