
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রকল্পের ভেতর বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও নির্মাণাধীন স্থাপনা থেকে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক তার এবং নির্মাণসামগ্রী নিয়মিত চুরি হওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশাল এই এলাকাজুড়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা বারবার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত পাঁচ মাসে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চুরি ও ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) আওতাধীন নির্মাণাধীন ‘ইনভেস্টরস ক্লাব’ থেকে ২৫ মিটার দীর্ঘ জায়ান্ট ইলেকট্রিক কেবল চুরি হয়। ফাইভ ফেস ১২০ আরএমের ওই তারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় চার লাখ টাকা। খবর পেয়ে জোরারগঞ্জ থানা ও চরশরৎ ক্যাম্প পুলিশ তিন ঘণ্টার প্রচেষ্টায় কাছাকাছি ঝোপঝাড় থেকে তারটি উদ্ধার করে, তবে চোরচক্র পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৫ মাসে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচটি চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে জোরারগঞ্জ থানা ও চরশরৎ ক্যাম্প পুলিশ ৩ ঘণ্টার মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঝোপঝাড় থেকে তারটি উদ্ধার করে।
এর আগে গত ১৪ এপ্রিল ‘হেলথ কেয়ার লাইফ সায়েন্স লিমিটেডের’ সীমানাপ্রাচীর টপকে দুর্বৃত্তরা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে কর্মীদের ধাওয়ায় পালিয়ে যায়। পরবর্তী বড় ঘটনাটি ঘটে ৮ আগস্ট রাতে, যখন ১০-১৫ জনের এক সশস্ত্র ডাকাত দল ‘বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজে’ ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে তিনটি মোবাইল ও ২৫০ মিটার বৈদ্যুতিক তার লুটে নেয়। ওই ঘটনায় পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও চোরদের দৌরাত্ম্য কমেনি। যদিও এসব ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিছু লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে, তবুও চোরচক্রের দৌরাত্ম্য থামছে না। এ ঘটনায় পুলিশ পরে অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার করে। এছাড়া গত ১৪ এপ্রিল রাতে ‘হেলথ কেয়ার লাইফ সায়েন্স লিমিটেডের’ সীমানাপ্রাচীর টপকে ৫-৬ জন দুর্বৃত্ত ভেতরে প্রবেশ করে হামলা চালানোর চেষ্টা করলে কর্মীদের ধাওয়ায় তারা পালিয়ে যায়। আমরা বেজার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি।
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবদুস সামাদ জানান, প্রায় ৩০ হাজার একর বিস্তৃত এলাকায় অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব বেজা ও সরকারের। তার মতে, হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এমন আতঙ্কের মধ্যে ব্যবসা চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের এক কর্মকর্তার মতে, পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্য সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় বিশাল এলাকাটির নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি রাতে অতিরিক্ত আনসার মোতায়েন, পুলিশি টহল বৃদ্ধি, নিয়মিত ঝোপঝাড় পরিষ্কার এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এর নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন সিকিউরিটি অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন একশ জন নিরাপত্তাকর্মী যুক্ত হবে। এছাড়া বর্তমান ছয় ফুট উঁচু সীমানাপ্রাচীর বাড়িয়ে ১৩ ফুট করা এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে শুরু হতে পারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এর নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহবুব জানান, নিরাপত্তা জোরদারে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিল্প পুলিশের ক্যাম্প ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম জানান, এলাকাটি এখনো সীমানাপ্রাচীর ও গেট দিয়ে পুরোপুরি আবদ্ধ নয়, যে কারণে বাইরের লোকজনের অবাধ প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। এদিকে জেলা শিল্প পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, পুরো শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৬০ সদস্যের একটি পৃথক ‘শিল্প পুলিশ-৯’ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ যৌথভাবে টহল দিচ্ছে। জোরারগঞ্জ থানার ওসি মো. আবদুল হালিম কারখানা মালিকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা, লাইটিং ও নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীর অভাব রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রধান প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
প্রতিনিধির নাম 

























