ব্যাংক খাত সংস্কারে ১২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে

দেশের আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা, তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকার ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে প্রদান করবে এবং অবশিষ্ট ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। প্রকল্পটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য যে ১৫টি প্রকল্প রাখা হয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দুর্বলতা ভুগছে। অর্থাৎ নির্ধারিত কার্যক্রম ও ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা নিরসন, ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব এবং মূলধনসংকটে জর্জরিত ব্যাংক খাতের আধুনিকায়ন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের এই উদ্যোগে ব্যাংক পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে তদারকি সক্ষমতা ও আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক খাতের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার এবং তৃতীয় ধাপে প্রশাসনিক কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং অন্যান্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনাকাটায় ৭১১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নতির মাধ্যমে সাইবার ঝুঁকি ও আন্তসীমান্ত আর্থিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংক খাতের তদারকি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ জন্য আমানত বিমা তহবিলের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক পুনর্গঠন বা অবসায়ন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের পাওনা দ্রুত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ফেরাতে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত (পিবিসি) অনুসরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। কিছু ব্যাংক তারল্য ও মূলধনসংকটের মুখোমুখি রয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক সেবার জন্য উল্লেখযোগ্য অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে মোট ৭০ কোটি টাকা প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে, যার আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৫৬৫ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক সেবা বাবদ ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, পরামর্শক নিয়োগ, ডেটাবেজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিসামগ্রী কেনার জন্যও অর্থ রাখা হয়েছে।

এর আগে ২০১৫ সালে অনুমোদিত প্রথম পর্যায়ের ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট’ ২০২১ সালের মার্চে শেষ হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল ২৬২ মিলিয়ন ডলার। ওই প্রকল্পে আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ব্যাসেল কোর মূলনীতি অনুসরণের কাজগুলো করা হয়েছিল।

প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ঠিকই, তবে শুধু প্রযুক্তি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

ব্যাংক খাত সংস্কারে ১২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে

আপলোডের সময় : 09:35:09 am, Tuesday, 29 September 2026

দেশের আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা, তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকার ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে প্রদান করবে এবং অবশিষ্ট ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। প্রকল্পটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য যে ১৫টি প্রকল্প রাখা হয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দুর্বলতা ভুগছে। অর্থাৎ নির্ধারিত কার্যক্রম ও ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা নিরসন, ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব এবং মূলধনসংকটে জর্জরিত ব্যাংক খাতের আধুনিকায়ন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের এই উদ্যোগে ব্যাংক পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে তদারকি সক্ষমতা ও আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক খাতের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার এবং তৃতীয় ধাপে প্রশাসনিক কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং অন্যান্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনাকাটায় ৭১১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নতির মাধ্যমে সাইবার ঝুঁকি ও আন্তসীমান্ত আর্থিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংক খাতের তদারকি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ জন্য আমানত বিমা তহবিলের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক পুনর্গঠন বা অবসায়ন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের পাওনা দ্রুত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ফেরাতে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত (পিবিসি) অনুসরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। কিছু ব্যাংক তারল্য ও মূলধনসংকটের মুখোমুখি রয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক সেবার জন্য উল্লেখযোগ্য অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে মোট ৭০ কোটি টাকা প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে, যার আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৫৬৫ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক সেবা বাবদ ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, পরামর্শক নিয়োগ, ডেটাবেজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিসামগ্রী কেনার জন্যও অর্থ রাখা হয়েছে।

এর আগে ২০১৫ সালে অনুমোদিত প্রথম পর্যায়ের ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট’ ২০২১ সালের মার্চে শেষ হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল ২৬২ মিলিয়ন ডলার। ওই প্রকল্পে আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ব্যাসেল কোর মূলনীতি অনুসরণের কাজগুলো করা হয়েছিল।

প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ঠিকই, তবে শুধু প্রযুক্তি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।