
বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানির ওপর আরও বড় ধরনের শুল্কের খড়্গ নেমে এসেছে। দেশটির পাটপণ্য আমদানিতে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ১৪০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কাউন্টারভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) বা ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারত। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যে ৪৪৫ ডলার পর্যন্ত উচ্চহারের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল। পরপর এমন পদক্ষেপকে বাংলাদেশের পাট খাতের জন্য বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ও নেপালের পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড় ও পাটের স্যাকিং ব্যাগে প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক ছিল। পরে বাংলাদেশি পাটের স্যাকিং কাপড়ও এর আওতায় আনা হয়।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিজিটিআর গত সোমবার এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখন সে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। ২০২৫ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশের পাটপণ্যে ১২ ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
ডিজিটিআরের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ২৪টি পাটকল সহায়তা করেছে। সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১০১ থেকে ১৩২ ডলার পর্যন্ত এবং অন্যদের জন্য ১১৬ ডলার শুল্কহারের প্রস্তাব রয়েছে। তবে যারা তদন্তে সহযোগিতা করেনি, তাদের জন্য ১৪০ দশমিক শূন্য ৪ ডলার শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া নেপালের রপ্তানিকারকদের জন্য ৫৪ থেকে ৬০ ডলার পর্যন্ত শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কহার প্রতি টনে ১০১ দশমিক ৫৪ থেকে ১৩২ দশমিক ৩৬ ডলার। সহযোগিতা করা বাকি ১৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১১৬ দশমিক ৪৮ ডলার। ছয় প্রতিষ্ঠানকে তিনটি রপ্তানিকারক গ্রুপে ভাগ করে তাদের জন্য আলাদা শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। নেপালের রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে শুল্কহার ৫৪ দশমিক ৭৭ থেকে ৬০ দশমিক ৫৪ ডলার।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বলবৎ থাকা অবস্থায় নতুন করে সিভিডি আরোপের আইনগত ভিত্তি নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নালিশ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সুরে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন বলেন, এটি বাংলাদেশের পাট খাতকে ধ্বংস করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যা সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে আরও জোরালো হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভারত ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর রেখেছে। নতুন করে ভর্তুকির নামে সিভিডি আরোপকে মন্ত্রণালয় ‘ডাবল রেমেডি’ বা একই বিষয়ের ওপর দ্বৈত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আইনি ভিত্তি ও হিসাব নিয়ে ডিজিটিআরের কাছে লিখিত আপত্তি জানানো হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি ও ভারতের নিজস্ব কাস্টমস ট্যারিফ আইনের ৯বি ধারা অনুযায়ী, একই অপরাধে দুই ধরনের শুল্ক একসঙ্গে আরোপের সুযোগ নেই।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে পাটপণ্যের রপ্তানিতে বেশ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১৬ কোটি ডলারের রপ্তানি হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরে সামান্য ইতিবাচক ধারায় ফিরে রপ্তানি ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ভারতের কঠোর বন্দর বিধিনিষেধের কারণে এখন কেবল নাভা শেভা বন্দর দিয়েই বাংলাদেশের পাটপণ্য ভারতে ঢুকছে। ডিজিটিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমেছে।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, সিভিডির তদন্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানিয়েও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য দুই দেশের যৌথ কার্যদলের বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে। সরকার আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসনের কোনো পথ বের করা সম্ভব হবে।
প্রতিনিধির নাম 

























