
২১ সেপ্টেম্বর, সোমবার। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছান বিএনপির চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরটি ছিল দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান। সর্বশেষ ২০০৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। ফলে দীর্ঘ দুই দশকের ব্যবধান ঘুচিয়ে প্রিয় নেতাকে কাছে পাওয়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আবেগ ও প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল তার প্রথম জাতিসংঘ সফর। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন। চার দিনের এই সফরে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৩০টি সরকারি কর্মযজ্ঞে অংশ নেন। এর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপচারিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সফরকালে তিনি ম্যানহাটনের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে অবস্থান করেন। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন, কুইন্স ও লং আইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও নিউজার্সি, পেনসিলভানিয়া, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে নেতা-কর্মীরা নিউইয়র্কে এসেছিলেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের এই সফর শেষে নেতাকর্মীদের একাংশের মাঝে আনন্দ ছাপিয়ে গভীর অপূর্ণতা, অভিমান এবং হতাশার সুর শোনা গেছে। নেতাকর্মীদের দাবি ছিল খুব সামান্য, কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার বা করমর্দনের যে সুযোগ তারা চেয়েছিলেন, তা অনেকের ক্ষেত্রেই অধরা থেকে গেছে। অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন কেবল নেতার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। কেউ শুধু মোবাইল ফোন হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, প্রিয় নেতার একটি ছবি তুলবেন বলে।
যুবদল কর্মী আসাদুজ্জামান রনি নিজের আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, তিনি কোনো পদ-পদবি বা বিশেষ সুবিধা চাইতে যাননি। দীর্ঘ ২০-২১ বছর ধরে তিনি যার রাজনীতি করছেন, সেই মানুষটিকে সামনে থেকে একটি সালাম দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। তিনি বলেন, ‘২১ বছর পর আমাদের নেতা নিউইয়র্কে এলেন। এত কাছে ছিলেন অথচ একনজর সামনে থেকে দেখতেও পারলাম না। এই কষ্টটা কীভাবে বোঝাব?’ ম্যারিল্যান্ড থেকে আসা যুবদলের আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শুধুমাত্র দেখার উদ্দেশ্যেই তিনি নিউইয়র্কে ছুটে এসেছিলেন। করমর্দনের সুযোগ পাওয়া একজন কর্মী জানান, কয়েক সেকেন্ডের জন্য হাত মেলাতে পেরেছেন, কিন্তু কথা বলার কোনো সুযোগ পাননি। এই প্রাপ্তিটুকু অনেক মনে হলেও, মনের গভীরে থেকেই গেছে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। কেউবা বহু বছরের ত্যাগ, সংগ্রাম, সাফল্য-ব্যর্থতা আর জমে থাকা কথাগুলো কয়েক মিনিটের জন্য হলেও তাঁর সামনে খুলে বলবেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, হয়তো কোনো একসময় লবিতে দেখা হয়ে যাবে; হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য কাছে যাওয়ার সুযোগ মিলবে। কারো কারো ভাগ্যে অবশ্য শেষ মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের সাক্ষাৎ মিলেছে।
নেতাকর্মীদের এই হতাশা ও ক্ষোভের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আনোয়ার হোসেন খোকন। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নেতাকর্মীদের দেখা না হওয়ায় একটি ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ তৈরি হয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ির কারণে অনেককে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৩০০-৪০০ কর্মীকে হোটেলে ঢুকতে দেওয়া হলেও, দলের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তিনি সচেষ্ট থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আনোয়ার হোসেন খোকন উপস্থিত ছিলেন না। তবে সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সদস্য গিয়াস আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সদস্য জিল্লুর রহমান জিল্লুর এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় সদস্যসহ অন্যান্যরা। কিন্তু এত সব গুরুত্বপূর্ণ নেতার উপস্থিতিতেও মাত্র ৩০-৩৫ জন দলীয় কর্মী শেষ পর্যন্ত সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পান। নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা নেতার কোনো সময় নষ্ট করতে চাননি। ৫০ বা ১০০ জনের একটি প্রতিনিধিত্বশীল বৈঠকের প্রত্যাশা ছিল তাদের, কিন্তু সেটি না হওয়ায় আবেগের জায়গায় অনেকটা অভিমান রয়ে গেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন দায়িত্ব পালনের বার্তা দিলেও, নিউইয়র্কের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনে রয়ে গেল দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার এক অম্ল-মধুর আবেশ।
প্রতিনিধির নাম 

























