
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বিভিন্ন বিমানঘাঁটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের লজিস্টিক সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি হামলার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর অবকাঠামো ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি ব্রিটেনের ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে একটি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনার পর এই বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজন ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক তিনটি গাড়ির উপস্থিতি এবং বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককেও আটক করা হয়। যদিও তাদের গাড়িতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি, তবে পেট্রল উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ইরানের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে ‘জোরালো প্রমাণ’ থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ব্রিটিশ ঘাঁটি ফেয়ারফোর্ডকে ঘিরে কয়েক দিন আগের একটি নিরাপত্তা ঘটনা ইউরোপীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ভূমিকা আবার সামনে এনেছে। ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহজনক যানবাহনের খবর পাওয়ার পর ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এক দিন পর তাঁদের সবাইকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের আগে তাঁদের একজন পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করেছিলেন বলেও জানা গেছে। জুলাইয়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি বিশেষভাবে ফেয়ারফোর্ডের নাম উল্লেখ করে সতর্ক করেছিল।
ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিটি এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্রিয় কেন্দ্রগুলোর একটি। গত ৬ মার্চ থেকে এই ঘাঁটিতে মার্কিন বি-১বি ল্যান্সার এবং পরবর্তীতে ৯ মার্চ বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। উন্মুক্ত সূত্র ও ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্যানুযায়ী, ১৩ মার্চের মধ্যে সেখানে বোমারু বিমানের সংখ্যা ১৮টিতে পৌঁছায়, যার মধ্যে ১২টি ছিল বি-১বি ও ছয়টি বি-৫২। এই মোতায়েন ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ। যুদ্ধের শুরুর দিকে লন্ডন দাবি করেছিল যে তারা সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছে না, তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ১ মার্চ বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তারা এটিকে মিত্রদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে অভিহিত করলেও, ইরানের অভ্যন্তরে হামলার ঘটনায় আইনি বিতর্কের জন্ম হয়। তারা বলেছিল, ইরানে বোমা হামলার জন্য ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলো ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। এসব বিমান থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের মাটি ব্যবহারে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছিল। পর্তুগালের লাজেস ঘাঁটি এবং গ্রিসের সুদা বে ছিল মূলত মার্কিন বাহিনীর জন্য ট্রানজিট ও লজিস্টিক সহায়তার প্রধান কেন্দ্র। পর্তুগিজ সরকার জানিয়েছে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত লাজেস ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানের ৭৬টি অবতরণ এবং ২৫টি ফ্লাইট অনুমোদিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী লুইজ মন্টেনেগ্রোর সরকার দাবি করেছে, তারা কেবল প্রতিরক্ষা ও প্রয়োজনীয় মিশনের জন্যই অনুমতি দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের বেশ কিছু অনুরোধ প্রত্যাখ্যানও করেছে। এদিকে, গ্রিসের সুদা ঘাঁটিতে রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি লজিস্টিক কার্যক্রম অব্যাহত ছিল, যা স্থানীয়দের মধ্যে প্রতিবাদের সৃষ্টি করেছিল।
ফ্রান্স এবং ইতালি তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ সি-১৭ পরিবহন বিমান ও কেসি-১৩৫ ট্যাংকার মোতায়েনের অনুমতি দিলেও যুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ ছিল। মার্চ মাসের শেষের দিকে ফ্রান্স মার্কিন অস্ত্রবাহী বিমানের জন্য আকাশসীমা ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে। একইভাবে, ইতালি আভিয়ানো ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন বিমানের অবতরণের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, রোম কেবল প্রযুক্তিগত ও অ-যুদ্ধ কার্যক্রমের জন্যই সহায়তা দিচ্ছে। জুন মাসে মার্কিন অভিযানের সমর্থনে ৫০০ সেনার উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের জবাবে ইতালি পুনরায় তাদের এই অ-যুদ্ধ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে।
স্পেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করলে অন্তত ১৫টি মার্কিন সামরিক বিমান, বিশেষ করে কেসি-১৩৫ ট্যাংকারগুলো স্পেন ছাড়তে বাধ্য হয়। এর মধ্যে সাতটি বিমান জার্মানির রামস্টাইনে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের সাথে স্পেনের কূটনৈতিক টানাপড়েন তৈরি করে এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, জার্মানি রামস্টাইন এবং স্প্যাংডালেম ঘাঁটিকে মার্কিন লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দিলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস এটিকে ন্যাটোর মিশন নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে জার্মানিতেই এই মোতায়েন নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো বিদ্যমান, কারণ রামস্টাইন থেকে মার্কিন নির্দেশিত অস্ত্র পরিবহনের প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, পোল্যান্ডভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো সামরিক সম্পদের পরিমাণ ওই অঞ্চলে থাকা মোট সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ব্রিটেন থেকে অন্তত ৩০টি এফ-৩৫ এবং ৩৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ইসরায়েল ও জর্ডানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। তবে ব্রিটিশ সরকার বরাবরই জোর দিয়ে বলেছে যে, সাইপ্রাসের অ্যাক্রোতিরি ঘাঁটির মতো তাদের অন্যান্য স্থাপনাগুলো কখনোই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে ব্যবহৃত হয়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান মার্কিন ও ইসরায়েলি উভয় হামলারই নিন্দা জানিয়েছেন। পরিশেষে, ইউরোপের প্রতিটি দেশই তাদের কৌশলগত স্বার্থ ও সামরিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, যা আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে বেশ জটিল এক সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 

























