মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবৃদ্ধি: যুদ্ধের প্রস্তুতি না কি কূটনৈতিক চাপ?

ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচির বিপরীতে ওয়াশিংটন তাদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা, যুদ্ধবিমান এবং বিমানবাহী রণতরি মোতায়েনের প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রণপ্রস্তুতির মাধ্যমে ইরানকে বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অথবা তেহরানকে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে চাপে রাখার একটি কৌশল হিসেবেই এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবে এসব মোতায়েনের মাধ্যমে তিনি ইরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন কিনা তা-ও স্পষ্ট নয়। একই সময়ে সংঘাত আরও বাড়ানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পথই বিবেচনা করছে উভয় পক্ষ। সর্বশেষ সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এর মাধ্যমে ইরানবিরোধী যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দেখে নেয়া যাক।

মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন করার তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তা। এরই অংশ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বহরটি রোববার মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এরপরই মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের অংশ হিসেবে ২ হাজারের বেশি সেনাসদস্য রওনা হয়। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে নৌবাহিনীর এই বিশাল মোতায়েনে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনাসদস্য যুক্ত হচ্ছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে জানা গেছে। এতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার শক্তির সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের সূত্র অনুযায়ী, কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি যাই হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি টেবিলে রেখে দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় মার্কিন বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। তবে এই সামরিক তৎপরতার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায়, ট্রাম্পের দল রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ভোটারদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। সেই নির্বাচনে নিজের পতনশীল ইমেজ কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প এমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারেন। যুদ্ধ পরিচালনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক নেটওয়ার্ক বজায় রেখে আসছে। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আটটি স্থায়ী ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি নতুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সম্প্রসারণ। এর মধ্যে ই-৩ সেন্ট্রি, এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ইরানের চারপাশ আবার ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে মার্চ মাসে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে তিনটি পৃথক ইউনিটে সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ, যার নেতৃত্বে ছিল ইউএসএস ত্রিপোলি ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। দ্বিতীয়টি ছিল ইউএসএস বক্সারকেন্দ্রিক ১১তম মেরিন ইউনিট, যা ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিককে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত করে। সবশেষে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার সেনা সেখানে যোগ দেয়। সব মিলিয়ে ইরানবিরোধী যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার শর্তসাপেক্ষে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ অবমুক্তির দাবি জানানো হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেও আলোচনার মূল এজেন্ডায় দেখতে চায়। এদিকে, ইরানে হামলা আরও বাড়ানো সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য না করলেও সামরিক কৌশলগত গোপনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। পেন্টাগনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও অঞ্চল থেকে সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়ার কোনো লক্ষ্য আপাতত নেই যুক্তরাষ্ট্রের।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবৃদ্ধি: যুদ্ধের প্রস্তুতি না কি কূটনৈতিক চাপ?

আপলোডের সময় : 10:54:55 am, Saturday, 3 October 2026

ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচির বিপরীতে ওয়াশিংটন তাদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা, যুদ্ধবিমান এবং বিমানবাহী রণতরি মোতায়েনের প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রণপ্রস্তুতির মাধ্যমে ইরানকে বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অথবা তেহরানকে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে চাপে রাখার একটি কৌশল হিসেবেই এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবে এসব মোতায়েনের মাধ্যমে তিনি ইরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন কিনা তা-ও স্পষ্ট নয়। একই সময়ে সংঘাত আরও বাড়ানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পথই বিবেচনা করছে উভয় পক্ষ। সর্বশেষ সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এর মাধ্যমে ইরানবিরোধী যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দেখে নেয়া যাক।

মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন করার তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তা। এরই অংশ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বহরটি রোববার মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এরপরই মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের অংশ হিসেবে ২ হাজারের বেশি সেনাসদস্য রওনা হয়। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে নৌবাহিনীর এই বিশাল মোতায়েনে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনাসদস্য যুক্ত হচ্ছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে জানা গেছে। এতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার শক্তির সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের সূত্র অনুযায়ী, কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি যাই হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি টেবিলে রেখে দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় মার্কিন বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। তবে এই সামরিক তৎপরতার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায়, ট্রাম্পের দল রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ভোটারদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। সেই নির্বাচনে নিজের পতনশীল ইমেজ কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প এমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারেন। যুদ্ধ পরিচালনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক নেটওয়ার্ক বজায় রেখে আসছে। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আটটি স্থায়ী ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি নতুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সম্প্রসারণ। এর মধ্যে ই-৩ সেন্ট্রি, এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ইরানের চারপাশ আবার ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে মার্চ মাসে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে তিনটি পৃথক ইউনিটে সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ, যার নেতৃত্বে ছিল ইউএসএস ত্রিপোলি ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। দ্বিতীয়টি ছিল ইউএসএস বক্সারকেন্দ্রিক ১১তম মেরিন ইউনিট, যা ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিককে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত করে। সবশেষে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার সেনা সেখানে যোগ দেয়। সব মিলিয়ে ইরানবিরোধী যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার শর্তসাপেক্ষে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ অবমুক্তির দাবি জানানো হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেও আলোচনার মূল এজেন্ডায় দেখতে চায়। এদিকে, ইরানে হামলা আরও বাড়ানো সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য না করলেও সামরিক কৌশলগত গোপনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। পেন্টাগনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও অঞ্চল থেকে সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়ার কোনো লক্ষ্য আপাতত নেই যুক্তরাষ্ট্রের।