
দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিরাজ করছে গভীর অবকাঠামো ও শিক্ষকস্বল্পতা। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে মোট ১১০টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ১৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ বর্তমানে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি কলেজের নিজস্ব জমি বা ভবন নেই, ফলে ভাড়া করা জায়গা বা সদর হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অবস্থাই এর বড় উদাহরণ। ১০ বছর পার হলেও কলেজটি নিজস্ব জমি বা স্থায়ী ক্যাম্পাসের দেখা পায়নি। ২০১৮ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে মাত্র তিন হাজার বর্গফুট জায়গায় পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে চলছে পাঠদান। একইভাবে নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও নীলফামারী মেডিকেল কলেজগুলোরও নিজস্ব জায়গা নেই। নওগাঁ ও মাগুরা মেডিকেল কলেজের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক, যেখানে জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ার্ড বা বারান্দায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন রেজিস্ট্রার। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কলেজগুলো বিপুল ঘাটতি নিয়ে চলছে।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিটি জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রশাসনিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইচ্ছায় এসব কলেজ গড়ে তোলা হয়। যেমন, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের চিকিৎসকদের আবাসন ভবন, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালটির অবস্থান শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে। এসব কলেজ তুলনামূলকভাবে নতুন, প্রতিষ্ঠাকাল ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এসব মেডিকেল কলেজ ঘুরে দেখেছেন প্রতিনিধিরা।
পাবনা, গোপালগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, পটুয়াখালী ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের নিজস্ব জমি ও ভবন থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাসপাতাল ও কলেজ ভবনের দূরত্বের কারণে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পাবনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজ থেকে সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার, যা প্রাত্যহিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এমনই একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘প্রত্যেক মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল থাকে। আবাসনের ব্যবস্থা না হওয়ায় পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৬৭ জন ছাত্রী অব্যবহৃত একটি ভবনে থাকেন।
চিকিৎসা শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হলো শিক্ষক। ১৬টি মেডিকেল কলেজেই তীব্র শিক্ষকসংকট বিদ্যমান। মাগুরা মেডিকেল কলেজে ৮৪টি পদের মধ্যে ৬২ শতাংশই খালি। পাবনা মেডিকেল কলেজে ১৮ বছর পরও মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকের ৫০ শতাংশ পদ শূন্য। বায়োকেমিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ২০১৬ সাল থেকে মাত্র একজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। এই ১৬টি মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষক পদের ৬৩ শতাংশই বর্তমানে ফাঁকা রয়েছে।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য আইটেম ও কার্ড পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কলেজে আটটি মৌলিক বিষয়ের মধ্যে অধিকাংশ পদই শূন্য। এটি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই হাসপাতালে রেজিস্ট্রার না থাকায় আমাদের কাজের তদারক করার কেউ নেই।
সরকার পরিবর্তনের পরও এই সংকট নিরসনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মুন্সিগঞ্জে নতুন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য একটি মেডিকেল কলেজ এবং নরসিংদীতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।
নরসিংদী মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেখানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে বিদ্যমান ১০০ শয্যার হাসপাতালের জনবল কাঠামোই দুর্বল। তবুও এটিকে মেডিকেল কলেজ হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে; শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে জমি নির্ধারণ করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কারণেই শিক্ষার মান ও অবকাঠামোর এই করুণ দশা। দেশে বর্তমানে সরকারি ৩৭টি, সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে ৭টি এবং ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। ১১০টি কলেজের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব রয়েছে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।
প্রতিনিধির নাম 
























