চরাঞ্চলের আতঙ্কিত জনপদ মরারচর: হত্যাকাণ্ডের সুযোগে ৫০ বাড়িতে লুটপাটের তাণ্ডব, গ্রেফতার ও হামলায় এলাকা পুরুষশূন্য

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চড়ইকুড়ি মরার চরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি পটল গ্রুপ ও আজাদ বিশ্বাস গ্রুপের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে পটল গ্রুপের প্রধান পটলের আপন ভাই গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যাঙ্গর (৬০) নিহত হন। এই খুনের ঘটনাকে পুঁজি করে চরম তাণ্ডবে মেতে ওঠে পটল গ্রুপের সমর্থকরা।
সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই চড়ইকুড়ি মরারচর ও নিচপাড়া এলাকায় একের পর এক লুটপাট চালায় প্রতিপক্ষের লোকেরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতেই মরারচরে পটল, তার ছেলে মাসুম, রাজ্জাক, শাহ জামাল এবং চল্লিশ পাড়ার আইয়ুব মেম্বারের নেতৃত্বে একটি লুটেরা বাহিনী তাণ্ডব শুরু করে। তারা আজাদ বিশ্বাস, টনি বিশ্বাস, ডন বিশ্বাস, নায়েব মন্ডল, রাজু মন্ডল, রনি, সেন্টু, সোহেল, কাজল বিশ্বাস, আক্তার বিশ্বাসসহ এলাকার প্রায় ৫০টি বাড়িতে একযোগে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। কেবল ঘরবাড়ি ধ্বংস করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, হামলাকারীরা বাড়ির নারীদেরও মারধর করে।
পরবর্তী দিনগুলোতেও এই তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। আইয়ুব মেম্বার, পটল ও তার ছেলে মাসুমের সঙ্গে তোফাজ্জেল, সাইদুল, আরিফুল, আক্কাস, মিন্টু, আসিফ, সজল, মিঠু, রুবেলসহ ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল জিম্মি করে ফেলে সম্পূর্ণ এলাকাকে। তারা ঘরের নারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০টি মোটরসাইকেল, নগদ প্রায় ১৮ লাখ টাকা, ৪০ ভরি স্বর্ণালংকার, ২০টি গরু, ৪০টি ছাগল, ৩০টি ভেড়া এবং প্রচুর আসবাবপত্র লুট করে নেয়। এমনকি ঘরের চাল, ডাল, রান্নার গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, টিভি, ফ্রিজ ও বাসাবাড়ির থালাবাসন পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।
এদিকে যাদের সাথে সরাসরি কোনো শত্রুতা বা খুনের সম্পৃক্ততা নেই, তারাও এই অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে এখনো মোটরসাইকেল, ছাগল ও মহিষ কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে পটলের ছেলে মাসুম ও তার সহযোগীরা। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, লুটপাট ঠেকাতে তারা থানা-পুলিশ ও বিজিবির কাছে সাহায্য চেয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
লুটপাট ও গ্রেফতারের ভয়ে পুরো চড়ইকুড়ি মরারচর ও নিচপাড়া এলাকা এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। হামলা ও নতুন করে আক্রমণের আশঙ্কায় পুরুষরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, পাশাপাশি সংঘর্ষে আহত অনেকেই আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিটি পরিবারে এখন কেবলই অজানা আতঙ্ক।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলামও এই লুটপাটের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্যাঙ্গরের মৃত্যুকে পুঁজি করে পটল ও তার দলবল প্রায় ৫০টি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। গৃহপালিত পশু থেকে শুরু করে হাঁস-মুরগি ও থালাবাসন পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, সংঘর্ষে গোলাম মোস্তফা ট্যাঙ্গর নিহতের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ শাহজামাল নামে এজাহারনামীয় এক আসামিকে আটক করেছে। তবে এলাকা জুড়ে ব্যাপক লুটপাটের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এক জোড়া গরু নিয়ে যাওয়ার সময় টহলরত বিজিবি তা আটক করে ক্যাম্পে রেখেছে।
প্রতিনিয়ত আতঙ্কের ছায়ায় দিন কাটানো চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখন কেবল শান্তিতে বাঁচতে চান। তারা এই তাণ্ডবের তীব্র বিচার চান এবং প্রকাশ্যে লুটপাটে জড়ানো অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

চরাঞ্চলের আতঙ্কিত জনপদ মরারচর: হত্যাকাণ্ডের সুযোগে ৫০ বাড়িতে লুটপাটের তাণ্ডব, গ্রেফতার ও হামলায় এলাকা পুরুষশূন্য

আপলোডের সময় : 10:54:58 am, Monday, 5 October 2026
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চড়ইকুড়ি মরার চরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি পটল গ্রুপ ও আজাদ বিশ্বাস গ্রুপের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে পটল গ্রুপের প্রধান পটলের আপন ভাই গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যাঙ্গর (৬০) নিহত হন। এই খুনের ঘটনাকে পুঁজি করে চরম তাণ্ডবে মেতে ওঠে পটল গ্রুপের সমর্থকরা।
সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই চড়ইকুড়ি মরারচর ও নিচপাড়া এলাকায় একের পর এক লুটপাট চালায় প্রতিপক্ষের লোকেরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতেই মরারচরে পটল, তার ছেলে মাসুম, রাজ্জাক, শাহ জামাল এবং চল্লিশ পাড়ার আইয়ুব মেম্বারের নেতৃত্বে একটি লুটেরা বাহিনী তাণ্ডব শুরু করে। তারা আজাদ বিশ্বাস, টনি বিশ্বাস, ডন বিশ্বাস, নায়েব মন্ডল, রাজু মন্ডল, রনি, সেন্টু, সোহেল, কাজল বিশ্বাস, আক্তার বিশ্বাসসহ এলাকার প্রায় ৫০টি বাড়িতে একযোগে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। কেবল ঘরবাড়ি ধ্বংস করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, হামলাকারীরা বাড়ির নারীদেরও মারধর করে।
পরবর্তী দিনগুলোতেও এই তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। আইয়ুব মেম্বার, পটল ও তার ছেলে মাসুমের সঙ্গে তোফাজ্জেল, সাইদুল, আরিফুল, আক্কাস, মিন্টু, আসিফ, সজল, মিঠু, রুবেলসহ ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল জিম্মি করে ফেলে সম্পূর্ণ এলাকাকে। তারা ঘরের নারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০টি মোটরসাইকেল, নগদ প্রায় ১৮ লাখ টাকা, ৪০ ভরি স্বর্ণালংকার, ২০টি গরু, ৪০টি ছাগল, ৩০টি ভেড়া এবং প্রচুর আসবাবপত্র লুট করে নেয়। এমনকি ঘরের চাল, ডাল, রান্নার গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, টিভি, ফ্রিজ ও বাসাবাড়ির থালাবাসন পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।
এদিকে যাদের সাথে সরাসরি কোনো শত্রুতা বা খুনের সম্পৃক্ততা নেই, তারাও এই অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে এখনো মোটরসাইকেল, ছাগল ও মহিষ কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে পটলের ছেলে মাসুম ও তার সহযোগীরা। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, লুটপাট ঠেকাতে তারা থানা-পুলিশ ও বিজিবির কাছে সাহায্য চেয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
লুটপাট ও গ্রেফতারের ভয়ে পুরো চড়ইকুড়ি মরারচর ও নিচপাড়া এলাকা এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। হামলা ও নতুন করে আক্রমণের আশঙ্কায় পুরুষরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, পাশাপাশি সংঘর্ষে আহত অনেকেই আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিটি পরিবারে এখন কেবলই অজানা আতঙ্ক।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলামও এই লুটপাটের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্যাঙ্গরের মৃত্যুকে পুঁজি করে পটল ও তার দলবল প্রায় ৫০টি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। গৃহপালিত পশু থেকে শুরু করে হাঁস-মুরগি ও থালাবাসন পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, সংঘর্ষে গোলাম মোস্তফা ট্যাঙ্গর নিহতের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ শাহজামাল নামে এজাহারনামীয় এক আসামিকে আটক করেছে। তবে এলাকা জুড়ে ব্যাপক লুটপাটের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এক জোড়া গরু নিয়ে যাওয়ার সময় টহলরত বিজিবি তা আটক করে ক্যাম্পে রেখেছে।
প্রতিনিয়ত আতঙ্কের ছায়ায় দিন কাটানো চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখন কেবল শান্তিতে বাঁচতে চান। তারা এই তাণ্ডবের তীব্র বিচার চান এবং প্রকাশ্যে লুটপাটে জড়ানো অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।