ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ৬ হাজার

শিক্ষাক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের দাবি ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন যৌক্তিক অধিকার আদায়ের লক্ষে ফ্রান্সজুড়ে বর্তমানে বড় ধরনের অস্থিরতা চলছে। সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় অবকাঠামো এবং শিক্ষক সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার প্রতিবাদেই মূলত শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন। দেশটির শত শত স্কুলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। তার দাবি, আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকেই ‘অতি সহিংস’ কিছু গোষ্ঠী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে পড়ে এবং তারা ক্ষমার অযোগ্য আচরণ করছে।

বিক্ষোভের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের সংঘর্ষে ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য এবং ২১৫ জন তরুণ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে সোমবার এক শিক্ষার্থীর হাত বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার ঘটনাটি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। এ ছাড়া আন্দোলনের শুরু থেকেই কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে অন্য এক শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আহত হন। লঁসের ঘটনাটি দাঙ্গা পুলিশি স্টান গ্রেনেড থেকে ঘটেছে, নাকি শিক্ষার্থী সেটি কুড়িয়ে পাওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়েছে—তা নিয়ে নানামুখী প্রতিবেদন রয়েছে। এ সময় ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের জাতীয় শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আহত তরুণের প্রতি তিনি সমবেদনা জানাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আন্দোলনে চরম সহিংসতা ও উস্কানিদাতাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও তিনি স্কুল অবরোধের মতো কর্মসূচির ঘোর বিরোধী। তবে ছাত্র সংগঠন ‘লে লিসেয়াঁ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট লুই লেতুবলোঁ মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বলেন, কেবল সহমর্মিতা প্রকাশ যথেষ্ট নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন। আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক ঘটনা।’’।

আন্দোলনটি এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অভিভাবক এবং একাধিক বড় শ্রমিক সংগঠনও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে রাজপথে নেমেছে। প্যারিস, লিয়ন ও মার্সেইসহ প্রায় ৩০টি শহরে মঙ্গলবার বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের শীর্ষ শ্রমিক সংগঠন ‘সিএফডিটি’ ও শিক্ষক সংগঠন ‘এসএনইএস-এফএসইউ’ তাদের সদস্যদের বিক্ষোভে সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী সাদা বাহুবন্ধনী পরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি তুলছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনেকেই সাদা বাহুবন্ধনী পরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ পরিসর তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

সরকার পক্ষ থেকে দাবির কিছু বিষয় সমাধানের আশ্বাস দিলেও, আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ‘ইউনিয়ন সিদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল)’ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।

বামপন্থি দল ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজে (এলএফআই)’ নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এই আন্দোলনকে ১৯৬৮ সালের গণ-অস্থিরতার পর শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সে সময় ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতার মুখে শ্রমিকরা ধর্মঘটে শামিল হয়েছিল। এবার উচ্চবিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ও শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণে এক নতুন রূপ নিয়েছে। কয়েক দিন ধরে চলা সংঘর্ষের পর মঙ্গলবারের আন্দোলনে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দেশটির বেশ কয়েকটি বড় শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ৬ হাজার

আপলোডের সময় : 10:42:01 am, Wednesday, 7 October 2026

শিক্ষাক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের দাবি ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন যৌক্তিক অধিকার আদায়ের লক্ষে ফ্রান্সজুড়ে বর্তমানে বড় ধরনের অস্থিরতা চলছে। সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় অবকাঠামো এবং শিক্ষক সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার প্রতিবাদেই মূলত শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন। দেশটির শত শত স্কুলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। তার দাবি, আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকেই ‘অতি সহিংস’ কিছু গোষ্ঠী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে পড়ে এবং তারা ক্ষমার অযোগ্য আচরণ করছে।

বিক্ষোভের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের সংঘর্ষে ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য এবং ২১৫ জন তরুণ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে সোমবার এক শিক্ষার্থীর হাত বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার ঘটনাটি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। এ ছাড়া আন্দোলনের শুরু থেকেই কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে অন্য এক শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আহত হন। লঁসের ঘটনাটি দাঙ্গা পুলিশি স্টান গ্রেনেড থেকে ঘটেছে, নাকি শিক্ষার্থী সেটি কুড়িয়ে পাওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়েছে—তা নিয়ে নানামুখী প্রতিবেদন রয়েছে। এ সময় ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের জাতীয় শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আহত তরুণের প্রতি তিনি সমবেদনা জানাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আন্দোলনে চরম সহিংসতা ও উস্কানিদাতাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও তিনি স্কুল অবরোধের মতো কর্মসূচির ঘোর বিরোধী। তবে ছাত্র সংগঠন ‘লে লিসেয়াঁ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট লুই লেতুবলোঁ মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বলেন, কেবল সহমর্মিতা প্রকাশ যথেষ্ট নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন। আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক ঘটনা।’’।

আন্দোলনটি এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অভিভাবক এবং একাধিক বড় শ্রমিক সংগঠনও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে রাজপথে নেমেছে। প্যারিস, লিয়ন ও মার্সেইসহ প্রায় ৩০টি শহরে মঙ্গলবার বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের শীর্ষ শ্রমিক সংগঠন ‘সিএফডিটি’ ও শিক্ষক সংগঠন ‘এসএনইএস-এফএসইউ’ তাদের সদস্যদের বিক্ষোভে সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী সাদা বাহুবন্ধনী পরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি তুলছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনেকেই সাদা বাহুবন্ধনী পরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ পরিসর তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

সরকার পক্ষ থেকে দাবির কিছু বিষয় সমাধানের আশ্বাস দিলেও, আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ‘ইউনিয়ন সিদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল)’ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।

বামপন্থি দল ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজে (এলএফআই)’ নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এই আন্দোলনকে ১৯৬৮ সালের গণ-অস্থিরতার পর শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সে সময় ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতার মুখে শ্রমিকরা ধর্মঘটে শামিল হয়েছিল। এবার উচ্চবিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ও শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণে এক নতুন রূপ নিয়েছে। কয়েক দিন ধরে চলা সংঘর্ষের পর মঙ্গলবারের আন্দোলনে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দেশটির বেশ কয়েকটি বড় শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও।