নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাং দমনে পাঁচ দিনে ৫০০ আটক

নোয়াখালীর মাইজদী ও চৌমুহনীর মতো জনবহুল এলাকাসহ জেলার ৯টি উপজেলা ও পৌরসভায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির রাশ টানতে জেলা পুলিশ সম্প্রতি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। গত পাঁচ দিনের ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় ৫০০ কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। স্থানীয়রা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় পর্যায়ে এনটিএস, বিটিআর ও কেটিজিসহ অর্ধশতাধিক গ্যাংয়ের সক্রিয়তার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্যাং নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও উপদল তৈরি করে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার করছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, এসব গ্রুপের সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের কাছেই দামি মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল লক্ষ্য করা গেছে, যা জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

পৌর এলাকাগুলোসহ জেলার বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র, স্কুল-কলেজের মাঠ, পরিত্যক্ত ভবন এবং রাস্তার মোড়ে গ্যাং সদস্যদের নিয়মিত আড্ডা দিতে দেখা যায়। নোয়াখালী পৌরসভা এলাকাতেই প্রায় ২৫টি গ্রুপের অস্তিত্ব রয়েছে। মাইজদী হাউসিং, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, কোর্ট স্টেশন এবং সোনাপুর কাঠপট্টিসহ বিভিন্ন এলাকা এখন তাদের অঘোষিত আড্ডাস্থল। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমেও অনেক গ্রুপ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে তথ্য রয়েছে। জেলা শহর, উপজেলা ও পৌর এলাকার বিনোদনকেন্দ্র, গলি, পার্ক, স্কুল-কলেজ, হাটবাজার, সড়কের মোড়, সেতু-কালভার্ট, চায়ের দোকান, পরিত্যক্ত বাড়ি ও বাগানবাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। স্কুল ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠও তাদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। প্রতিটি গ্রুপের অধীনে আবার একাধিক উপদলও রয়েছে। মাইজদী হাউসিং, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, মুরগির ফার্ম, জহিরুল হক মিয়ার গ্যারেজ, কোর্ট স্টেশন, নাপিতের পোল, খন্দকারপাড়া, বচিরার দোকান, মাস্টারপাড়া, মাইজদী বাজার, স্টেশন রোড ও স্টেশন এলাকায় তাদের তৎপরতা রয়েছে। এছাড়া দত্তবাড়ির মোড়, দত্তেরহাট মোরগহাটা, সোনাপুর কাঠপট্টি, বিসিক শিল্পাঞ্চল ব্রিজ, কৃষ্ণরামপুর বোর্ড অফিস, হরিনারায়ণপুর ও কালিতারা বাজার এলাকাও কিশোর গ্যাংয়ের অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত।

কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত এক বছরে জেলায় প্রায় ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযানের বিষয়ে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, কিশোর অপরাধ এখন সামাজিক উদ্বেগের বড় কারণ। আটককৃতদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়াতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পাবলিক প্রসিকিউটর শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, অপরাধমুক্ত কিশোরদের আইনি পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মূলধারায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তবে কিশোর অপরাধ রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা সমান জরুরি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এসব গ্রুপ পরিচালিত হওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, আগের সরকারের সময় সক্রিয় অনেক গ্যাং এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছে। এমন প্রেক্ষাপটে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোররা জন্মগতভাবে অপরাধী নয়; মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং খারাপ সঙ্গ তাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। যারা কিশোরদের ব্যবহার করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাং দমনে পাঁচ দিনে ৫০০ আটক

আপলোডের সময় : 10:56:54 am, Friday, 9 October 2026

নোয়াখালীর মাইজদী ও চৌমুহনীর মতো জনবহুল এলাকাসহ জেলার ৯টি উপজেলা ও পৌরসভায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির রাশ টানতে জেলা পুলিশ সম্প্রতি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। গত পাঁচ দিনের ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় ৫০০ কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। স্থানীয়রা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় পর্যায়ে এনটিএস, বিটিআর ও কেটিজিসহ অর্ধশতাধিক গ্যাংয়ের সক্রিয়তার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্যাং নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও উপদল তৈরি করে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার করছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, এসব গ্রুপের সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের কাছেই দামি মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল লক্ষ্য করা গেছে, যা জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

পৌর এলাকাগুলোসহ জেলার বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র, স্কুল-কলেজের মাঠ, পরিত্যক্ত ভবন এবং রাস্তার মোড়ে গ্যাং সদস্যদের নিয়মিত আড্ডা দিতে দেখা যায়। নোয়াখালী পৌরসভা এলাকাতেই প্রায় ২৫টি গ্রুপের অস্তিত্ব রয়েছে। মাইজদী হাউসিং, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, কোর্ট স্টেশন এবং সোনাপুর কাঠপট্টিসহ বিভিন্ন এলাকা এখন তাদের অঘোষিত আড্ডাস্থল। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমেও অনেক গ্রুপ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে তথ্য রয়েছে। জেলা শহর, উপজেলা ও পৌর এলাকার বিনোদনকেন্দ্র, গলি, পার্ক, স্কুল-কলেজ, হাটবাজার, সড়কের মোড়, সেতু-কালভার্ট, চায়ের দোকান, পরিত্যক্ত বাড়ি ও বাগানবাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। স্কুল ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠও তাদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। প্রতিটি গ্রুপের অধীনে আবার একাধিক উপদলও রয়েছে। মাইজদী হাউসিং, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, মুরগির ফার্ম, জহিরুল হক মিয়ার গ্যারেজ, কোর্ট স্টেশন, নাপিতের পোল, খন্দকারপাড়া, বচিরার দোকান, মাস্টারপাড়া, মাইজদী বাজার, স্টেশন রোড ও স্টেশন এলাকায় তাদের তৎপরতা রয়েছে। এছাড়া দত্তবাড়ির মোড়, দত্তেরহাট মোরগহাটা, সোনাপুর কাঠপট্টি, বিসিক শিল্পাঞ্চল ব্রিজ, কৃষ্ণরামপুর বোর্ড অফিস, হরিনারায়ণপুর ও কালিতারা বাজার এলাকাও কিশোর গ্যাংয়ের অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত।

কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত এক বছরে জেলায় প্রায় ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযানের বিষয়ে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, কিশোর অপরাধ এখন সামাজিক উদ্বেগের বড় কারণ। আটককৃতদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়াতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পাবলিক প্রসিকিউটর শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, অপরাধমুক্ত কিশোরদের আইনি পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মূলধারায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তবে কিশোর অপরাধ রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা সমান জরুরি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এসব গ্রুপ পরিচালিত হওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, আগের সরকারের সময় সক্রিয় অনেক গ্যাং এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছে। এমন প্রেক্ষাপটে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোররা জন্মগতভাবে অপরাধী নয়; মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং খারাপ সঙ্গ তাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। যারা কিশোরদের ব্যবহার করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।