আইসিসি অচল করার হুঁশিয়ারি রুবিওর, মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তোলপাড় বিশ্ব

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) অচল করে দেওয়ার লক্ষ্যে সরাসরি অভিযানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে নিয়োজিত বিশ্বের এই প্রথম স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতটির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এই আদালতকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ আখ্যা দিয়ে এর কার্যক্রম বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন শুক্রবার (৯ অক্টোবর) আইসিসির সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার খবর আসে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই আক্রমণাত্মক ঘোষণা দেওয়া হয়। হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘টুকরো টুকরো করে’ ভেঙে দেওয়ার অভিযান চলবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেওয়ার অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে সতর্ক করেন। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার ফলে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিসির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডলারে লেনদেন, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রযুক্তিসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে। মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন কোনোভাবেই আইসিসিকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ দেবে না। তিনি দাবি করেন, আদালতটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে এবং মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিচারিক প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আইসিসি হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র এর সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন মিত্রদেশগুলোকেও এই আদালতের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় মিত্রদেশ, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের মুখে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের যেকোনো পদক্ষেপের তুলনায় বিস্তৃত। এত দিন আইসিসির নির্দিষ্ট বিচারক ও কৌঁসুলিদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও এবার সরাসরি পুরো প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

মার্কিন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আইসিসির লেনদেন বন্ধ বা সীমিত করার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে না পারলে আদালতটির দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ অচল হওয়ার উপক্রম হবে। মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুকে ঘিরেই যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম প্রতিক্রিয়া। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিষয়টিও আদালতের তদন্তাধীন রয়েছে। অন্যদিকে আইসিসির যুক্তি, ফিলিস্তিন আদালতের সদস্য হওয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের এখতিয়ার তার রয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আইসিসি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করলেও কখনোই তা অনুসমর্থন করেনি। ফলে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই আদালতের সদস্য নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির নাগরিকত্বের ওপর নয়, বরং অপরাধ সংঘটনের স্থান ও অন্যান্য আইনি ভিত্তির ওপরও নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে আদালতের দৈনন্দিন কাজে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারলেও এককভাবে আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করার আইনি ক্ষমতা রাখে না। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি কতটা স্বাধীনভাবে তার বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে এবং ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্র আদালতটির অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় কতটা দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

আইসিসি অচল করার হুঁশিয়ারি রুবিওর, মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তোলপাড় বিশ্ব

আপলোডের সময় : 09:19:16 am, Saturday, 10 October 2026

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) অচল করে দেওয়ার লক্ষ্যে সরাসরি অভিযানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে নিয়োজিত বিশ্বের এই প্রথম স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতটির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এই আদালতকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ আখ্যা দিয়ে এর কার্যক্রম বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন শুক্রবার (৯ অক্টোবর) আইসিসির সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার খবর আসে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই আক্রমণাত্মক ঘোষণা দেওয়া হয়। হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘টুকরো টুকরো করে’ ভেঙে দেওয়ার অভিযান চলবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেওয়ার অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে সতর্ক করেন। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার ফলে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিসির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডলারে লেনদেন, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রযুক্তিসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে। মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন কোনোভাবেই আইসিসিকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ দেবে না। তিনি দাবি করেন, আদালতটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে এবং মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিচারিক প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আইসিসি হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র এর সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন মিত্রদেশগুলোকেও এই আদালতের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় মিত্রদেশ, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের মুখে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের যেকোনো পদক্ষেপের তুলনায় বিস্তৃত। এত দিন আইসিসির নির্দিষ্ট বিচারক ও কৌঁসুলিদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও এবার সরাসরি পুরো প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

মার্কিন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আইসিসির লেনদেন বন্ধ বা সীমিত করার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে না পারলে আদালতটির দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ অচল হওয়ার উপক্রম হবে। মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুকে ঘিরেই যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম প্রতিক্রিয়া। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিষয়টিও আদালতের তদন্তাধীন রয়েছে। অন্যদিকে আইসিসির যুক্তি, ফিলিস্তিন আদালতের সদস্য হওয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের এখতিয়ার তার রয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আইসিসি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করলেও কখনোই তা অনুসমর্থন করেনি। ফলে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই আদালতের সদস্য নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির নাগরিকত্বের ওপর নয়, বরং অপরাধ সংঘটনের স্থান ও অন্যান্য আইনি ভিত্তির ওপরও নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে আদালতের দৈনন্দিন কাজে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারলেও এককভাবে আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করার আইনি ক্ষমতা রাখে না। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি কতটা স্বাধীনভাবে তার বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে এবং ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্র আদালতটির অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় কতটা দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করে।