
পাবনার ঈশ্বরদী একসময় শিম উৎপাদনের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ছিল। এখানকার শিমের ব্যাপক চাহিদার কারণে এলাকাটিকে অনেকে ‘শিম চাষের রাজধানী’ হিসেবেও অভিহিত করেন। তবে চলতি মৌসুমে এই চিত্র পাল্টে গেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া এবং কৃষি উপকরণের সংকটে অনেক কৃষক শিম চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে শিম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৪৮০ হেক্টর জমিতে আবাদ কম হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ কম জমিতে এবার শিম চাষ হচ্ছে। তবে এবার সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। উপজেলায় শিম উৎপাদনের সবচেয়ে বড় এলাকা মুলাডুলি ইউনিয়ন। এসব কৃষি উপকরণ কিনতে গিয়ে তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
উপজেলার শিম আবাদের প্রায় ৮০ শতাংশই হয় মুলাডুলি ইউনিয়নে। পতিরাজপুর, আড়কান্দি, নেকড়হাটা, ফরিদপুর, রামেশ্বরপুর, শেখপাড়া, সড়াইকান্দি, বেতবাড়িয়া, রামনাথপুর, ডিলুহাট, বাঘহাছলা, বহরপুর ও দুর্গাপাড়াসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শিমের আবাদ হয়ে থাকে। এছাড়া দাশুড়িয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর, দুর্গাবাজার, মারমী ও কালিকাপুর দিঘীরপাড় এবং সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর, ভাড়ইমারী, নওদাপাড়া ও বক্তারপুর এলাকায়ও শিম চাষ চলমান রয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদীর মোট শিম আবাদি জমির প্রায় ৮০ শতাংশই এই ইউনিয়নে।
মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষকরা মাচান তৈরি করে শিমগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে অধিকাংশ কৃষকের অভিযোগ, প্রচুর শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। মুলাডুলি এলাকার কৃষক আশরাফুর ইসলাম জানান, জমি প্রস্তুতি, বীজ বপন ও মাচান তৈরির খরচ বাবদ বিঘা প্রতি প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর সার ও কীটনাশকের পেছনে নিয়মিত অর্থ ঢালতে হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাওয়া যায় না বলে তার অভিযোগ। মাঠে যদি তাদের দেখা না পাই, তাহলে তারা কোন মাঠে থাকেন।
কৃষক ইমরান জানান, জমিতে সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করেও গাছের ফুল ঝরা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বালাইনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শে ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো সমাধান মিলছে না। এছাড়া সার সংকটের কারণে বাজারে নিম্নমানের ও অবৈধ সার ও কীটনাশক ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। কৃষক আওয়াল বলেন, কৃষি অফিসের সেবায় পক্ষপাতিত্বের কারণে বাধ্য হয়ে তিনি কয়েক বছর ধরে শিম চাষ বন্ধ রেখেছেন। বাজারে নিম্নমানের বালাইনাশক বিক্রির বিষয়ে যথাযথ তদারকির অভাবকেও তারা দায়ী করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে কাজ করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। অথচ যোগাযোগ করলে তারা সবসময় কৃষকদের সেবা দিতে ব্যস্ত থাকার কথা বলেন। আরেক কৃষক আওয়াল জানান, তিনি প্রতি বছর প্রায় ১০ বিঘা জমিতে শিম চাষ করতেন।
কৃষকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন। তিনি জানান, অস্বাভাবিক গরম ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে শিমের ফুল ঝরে পড়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাজারে থাকা কীটনাশকগুলো সরকারের অনুমোদিত বলে তিনি দাবি করলেও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাবে বালাইনাশকের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা।
কৃষকদের হতাশা নিরসনে কৃষি বিভাগ পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে আব্দুল মমিন বলেন, বাজারে মানসম্মত সার ও বালাইনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিগগিরই এই সংকট কেটে যাবে এবং কৃষকদের অভিযোগগুলো আর থাকবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিনিধির নাম 



















