
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো শহরে কার্যত রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিল্লি পুলিশ ৪০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করে এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় ও ব্যারিকেড তৈরি করে। দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করতে মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪০ হাজারের বেশি সদস্য। বসানো হয় ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের স্পাইক স্ট্রিপ। পরবর্তীতে মমতা ও কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এতে বলা হয়, এসআইআর-সম্পর্কিত অনেকগুলো সিদ্ধান্ত অন্য দুজন কমিশনারের মতামত উপেক্ষা করে জ্ঞানেশ কুমার নিজে নেন।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র যন্তর মন্তরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। দিল্লির মেট্রোরেলের ৫৭টি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যদিও পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ৪৫টিতে সীমাবদ্ধ করা হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিল্লির প্রধান স্টেশনগুলোতে মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। যানজট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সহিংসতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারায় বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বন্ধ রাখা হয় দিল্লির প্রায় অর্ধশত মেট্রোরেল স্টেশন। বিক্ষোভের একদিন আগে থেকেই অন্যান্য প্রদেশ থেকে রাজধানীতে যানবাহন চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
পুলিশি কঠোরতায় এদিন অন্তত সাত হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এছাড়া সিপিআই (এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, বৃন্দা কারাত, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবকেও আটক করা হয়েছে। সিজেপির আইনি বিভাগের প্রধান রত্না সিং এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
অভিজিৎ দীপকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই বিমানবন্দর থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। এদিকে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল আটকের আগে এক প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিকে মোদি সরকারের অধীন ‘চরম স্বৈরাচারী শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, আটক ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি না দিলে আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। অনেকে এই পরিস্থিতিকে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকীতে সিজেপি ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। তাদের মূল অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। গত মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সিইসির সাথে অন্যান্য কমিশনারদের মতবিরোধ ও ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে, যা আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালে।
রাজধানীর বাইরেও এই বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাঙ্গালুরু ও মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। চণ্ডীগড়ে আম আদমি পার্টির কর্মী ও কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংহতি মিছিল করেছেন। এছাড়া দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট ও পাতিয়ালা হাউস আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করার সময় প্রায় চার শতাধিক আইনজীবীকে পুলিশ আটক করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, সরকার গণতন্ত্রকে স্তব্ধ করতে চাইছে। তিনি এক্সে দেওয়া পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে আগামীকাল সোমবার দিল্লিতে আরও বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল জানিয়েছেন, তারা সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
পুলিশি বাধার মুখে পড়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও সেখানে পৌঁছামাত্রই তাদের বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও অনেকের যন্ত্রপাতি পুলিশ জব্দ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কনট প্লেস মার্কেটে বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে ১৯ বছর বয়সী অভিজ্ঞান যাদব ও আদি শর্মা হামলার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নেতাদের আটক করা হলেও তাদের আন্দোলন থেমে থাকবে না। দলটির নেতা অজিঙ্ক শিন্ডে পরবর্তী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সংগঠনের দাবি, একটি অসাধু আমলা চক্রকে বাঁচাতে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে। এর আগে গত জুলাই মাসে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও দলটি একই ধরনের কর্মসূচি পালন করেছিল, যা তার পদত্যাগের পর স্থগিত করা হয়। বর্তমান সিইসির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
প্রতিনিধির নাম 

























