
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে গেছেন ৪ লাখ ১৭ হাজার ৮৭১ জন বাংলাদেশি। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০৪। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রায় ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৬ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯১। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারও চাপে পড়েছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ১৯ হাজার ৮৭৪ বাংলাদেশি কর্মী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার হার ৫৫ শতাংশ কমে গেছে। বিএমইটির পরিসংখ্যান বলছে, আলোচ্য সময়ে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১ জন, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গত দুই দিনে সৌদি আরবের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, বিমানঘাঁটি ও বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত চার বাংলাদেশি কর্মী নিহত হয়েছেন, যা শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সামগ্রিকভাবে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জন, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ লাখ ৫১ হাজার ৯৫ জন। অর্থাৎ সামগ্রিক কর্মসংস্থান প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের অবস্থাও একই। কুয়েতে চলতি বছর গেছেন ১৯ হাজার ৩৮৬ জন (গত বছর ছিল ২৯ হাজার ৫৬০), কাতারে গেছেন ৪১ হাজার ৫৭২ জন (গত বছর ছিল ৬৯ হাজার ৩৪১) এবং ইরাকে গেছেন ২ হাজার ৫৭৫ জন (গত বছর ছিল ৩ হাজার ৯৮ জন)। ব্যতিক্রম শুধু জর্ডান, যেখানে গত বছরের ৭ হাজার ৩২২ জনের বিপরীতে চলতি বছর ৯ হাজার ১৪৬ জন কর্মী গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭৩১।
করোনা পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বিদেশে কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন, যার মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই গিয়েছিলেন ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন। তখন মালয়েশিয়া ও ওমানের শ্রমবাজার বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের কল্যাণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে চলতি বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ প্রসঙ্গে জানান, দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। যেহেতু বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, তাই যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসীদের কাজ ও আয় চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তবে দেশটিতে একসময় বছরে দুই লাখের বেশি বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের নজির ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে শ্রমবাজারের বিকল্পগুলো এখনো খুব একটা কার্যকর হয়নি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা এলেও এখনো কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং ওমানের শ্রমবাজার ২০২৩ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটিয়ে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করাই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 

























