
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইমোজি। গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইমোজির শিরোপা পেয়েছে চোখের কোণ থেকে জল গড়ানো হলুদ হাসিমুখের সেই ছোট্ট প্রতীকটি। সাধারণ কোনো আনন্দ, দুঃখ বা পরিস্থিতির উত্তরণ—সবক্ষেত্রেই এখন ইমোজি ব্যবহারের প্রবণতা তুঙ্গে। গুগল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু শেষ ৭২ ঘণ্টায় ব্যক্তিগত চ্যাটে এই কান্নার ইমোজিটি অন্তত ১৫ বার ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি এখন এতটাই প্রভাবশালী যে, আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা মানুষের আসল মুখের অভিব্যক্তির মতোই একে প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপের ব্যক্তিগত চ্যাটের দিকে তাকালে দেখা যাবে, কেবল শেষ ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৫ বার। নতুন নতুন প্রতীক যখন প্রতিনিয়ত যোগাযোগের ধরন পাল্টে দিচ্ছে, তখন এই মিশ্র অর্থযুক্ত ইমোজিগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশ প্রভাব ফেলছে। বলা চলে, এখন এগুলো ডিজিটাল ডাস্টবিনে ফেলার সময় এসেছে।
একসময় আনন্দ প্রকাশের জন্য ‘কান্না-হাসি’ কিংবা কাত হওয়া ইমোজিগুলো ছিল সবার পছন্দের। তবে সময়ের সাথে রুচির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ৩০ বছরের কম বয়সীদের কাছে এই পুরোনো ইমোজিগুলো অনেকটা সেকেলে মনে হয়। এর পরিবর্তে তারা ‘মৃত মাথার খুলি’র ইমোজির মতো প্রতীক ব্যবহার করতে পছন্দ করে। ২০১৫ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি প্রথমবার ‘কান্না-হাসি’ ইমোজিকে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এগুলোর জনপ্রিয়তা অনেকটা কমেছে। বিয়ারের গ্লাস, চোখ ঢাকা বানর বা সানগ্লাস পরা হাসিমুখের ইমোজিগুলোও এখন জেন-জি প্রজন্মের কাছে অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। তবে ৩০ বছরের কম বয়সী কাউকে ওই পুরোনো ইমোজি পাঠালেই তারা উত্তরে আপনাকে হাসিতে মৃত মাথার খুলির ইমোজি পাঠিয়ে দেবে।
২০২৫-২৬ সালের ট্রেন্ড অনুযায়ী, ইমোজির আকর্ষণ এখন অনেকটাই এর মৌলিকত্বের ওপর নির্ভরশীল। তরুণ প্রজন্ম এখন প্রচলিত চিহ্নের চেয়ে ভিন্নধর্মী প্রতীক ব্যবহারে আগ্রহী। উদাহরণস্বরূপ, ভাঙা হৃদয়ের বদলে এখন মলিন বা ঝরে পড়া গোলাপ এবং লাইক চিহ্নের বদলে জোড়হাতের প্রতীকের ব্যবহার বেড়েছে। এমনকি ২০২১ সালে ৪৮২তম অবস্থানে থাকা ‘মোয়াই স্ট্যাচু’ ইমোজিটি বর্তমানে ৩৩তম অবস্থানে উঠে এসেছে, যা তরুণদের রুচির পরিবর্তনেরই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে উদ্বেগ, হতাশা বা অস্বস্তি প্রকাশের জন্য বিকৃত মুখের ইমোজি কিংবা চোখের নিচে কালচে দাগ থাকা মুখের ইমোজিও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আপনি কি নিজের বয়স লুকিয়ে তরুণ দেখাতে চান। তাই এটা খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোন ব্যবহার করে আগের মতো একই আবেগ প্রকাশ করলেও, তা ফুটিয়ে তুলতে তাদের ব্যবহৃত ছবির ধরন বদলে গেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ভ্রু কুঁচকানো বা ভাবলেশহীন মুখভঙ্গির বদলেই এখন এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
বোর্নমাউথ ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক ইমোজি দেখার সময় ঠিক তেমনই স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা আসল মানুষের আবেগ দেখার সময় ঘটে থাকে। প্রধান গবেষক ম্যাডেলিন মলি এলি জানান, এটি প্রমাণ করে যে ইমোজি নিছক কোনো মজার বিষয় নয়, বরং ডিজিটাল মিথস্ক্রিয়ার অত্যন্ত অর্থপূর্ণ আবেগময় সংকেত। এই গবেষণার ফলাফল আমাদের ডিজিটাল যোগাযোগের গভীরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বয়স্কদের মধ্যে অবশ্য ইমোজি ব্যবহারের হার কিছুটা কম, মূলত আত্মবিশ্বাসের অভাব বা আধুনিক যোগাযোগের এই ধরনের সাথে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে তারা কিছুটা পিছিয়ে থাকেন।
অবশ্য ইমোজির বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে রসিকতাও কম হয় না। টিকটকের অনেক ব্যবহারকারী মজা করে বলেন, ‘আসল কান্নার সময় ছাড়া বাকি সব সময়ই আমরা এই ইমোজি ব্যবহার করি।’ আবার কর্মক্ষেত্রে সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে অনেকে ম্যারাডোনা বা মারাকাস ইমোজির মতো ব্যতিক্রমী প্রতীকও বেছে নিচ্ছেন। দিনশেষে, আপনি এই জনপ্রিয় ইমোজিকে আনন্দ হিসেবে দেখেন নাকি বিষাদ হিসেবে, তা সম্পূর্ণ আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। ডিজিটাল এই যুগে ইমোজি কেবল প্রতীক নয়, বরং মানুষের অব্যক্ত অনুভূতির এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 

























