
সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণের পরও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটের জেরে গ্রাহকরা নির্ধারিত মূল্যে রান্নার গ্যাস পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও খুচরা বাজারে এটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারে তাঁর খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা, যা তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন। সেখানে এক দোকানি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম চেয়েছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা।
রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংকট। গ্রাহকদের অভিযোগ, বাড়তি দাম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে তাঁদের। গত ২ অক্টোবর রাজধানীর হাতিরপুলে ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকের গুনতে হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা, যেখানে সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ ঘাটতি ও উচ্চমূল্যে সিলিন্ডার কেনার কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিরপুর কিংবা মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, অনেক ডিলার ২০ সেপ্টেম্বরের পর আর নতুন করে গ্যাস পাননি। নতুন করে সরবরাহ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে ডিলারও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি।
নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে পরিবেশকদের ১ হাজার ৭৪২ টাকায় সিলিন্ডার কেনার কথা। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে গ্রাহক পর্যায়ের দাম হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ডিলার পর্যায়েই নিয়ম ভাঙার অভিযোগ উঠছে। মুন্সীগঞ্জের গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তিনি গ্যাস পাননি এবং নতুন দরেও কোম্পানি তার কাছে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে, যা নির্ধারিত পাইকারি মূল্যের চেয়ে বেশি। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিইআরসির কাছে দেওয়া অভিযোগ পত্রে দেখা যায়, ডিলারদের কাছে অনেক অপারেটর ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চাচ্ছে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের এই বাড়তি দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরিবেশকদের পক্ষে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি সম্ভব নয়। এতে অনেক ডিলার মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। গ্যাসবাহী গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তাঁর দাবি, নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে গেলে অনেক পরিবেশক পুঁজি হারানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধেও সমস্যায় পড়বেন।
বাংলাদেশে এলপিজির বাজারে ৯৮ শতাংশেরও বেশি নির্ভরতা বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর। দেশে ৩২-৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও মাত্র ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান আমদানি করছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন গ্যাস আমদানি হয়েছে। আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও কেন এই সংকট, তা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
গ্রিন এলপিজির জেনারেল ম্যানেজার আহসান হাবিব হিরো জানান, প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি আমদানি না করে অন্য অপারেটরের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে। সেপ্টেম্বরে ২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে তারা পেয়েছে মাত্র ১৫০ টন। অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক আমদানির কোটা, লাইসেন্স প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সীমাবদ্ধতাকে এই সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে কোনো কোনো কোম্পানি মজুত করার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে, যার ফলে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং ও অভিযান শুরু হয়েছে। বিইআরসিও সংকটের কারণ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। তথাপি, আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ের নানা জটিলতায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটছে না।
প্রতিনিধির নাম 

























