শহরের চাপ সামলাতে প্রয়োজন নতুন নগরায়ণ দর্শন

গত তিন-চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্রটি স্পষ্ট, যদিও এর সুফল কতটা সমবণ্টন হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এই অগ্রগতির সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটেছে আবাসন ও ভবন নির্মাণ শিল্পে। এখন শহর তো বটেই, গ্রামেও স্থায়ী পাকা ভবন নির্মাণের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। মানুষ কর্মসংস্থান বা প্রবাস থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে গ্রামে স্থায়ী বাড়ি করতে চাচ্ছেন, যা একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান কৃষিজমি ও ধানি জমি আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি মৌলিক বসতি পরিকল্পনা থাকলে এই উন্নয়ন অনেক বেশি শৃঙ্খলিত করা যেত, যা এখনও কিছুটা হলেও সম্ভব। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে বেড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। বিদেশে বা শহরে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পর অনেকেই গ্রামে নিজেদের একটি স্থায়ী বাড়ি করতে চান। আমরা নগর–পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু গ্রামীণ পরিকল্পনা নিয়ে কম ভাবি। অথচ বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করেন। এখনো সেই সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। শহর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় মানুষ কাজ, শিক্ষা ও জীবিকার জন্য শহরমুখী হচ্ছেন।

আমাদের নগরায়ণের মূল সমস্যা হলো শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ। মানুষ কাজের খোঁজে শহরমুখী হওয়ায় ঢাকার মতো শহরগুলো এই বিপুল চাপ নিতে পারছে না। ঢাকায় একজন সাধারণ কর্মী ৮০০, ১০০০ বা ১২০০ বর্গফুটের ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে চাইলেও গত ৫০ বছরে আমরা সেই চাহিদামতো পরিকল্পিত আবাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে পারিনি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ শহরে বাস করে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে যে ভবিষ্যতে আমাদের শহরে উঁচু ভবন ও উচ্চ ঘনত্বের জনবসতিই মূলধারা হবে। ঘনত্ব নিজেই সমস্যা নয়, বরং তাকে কীভাবে সৃজনশীল ব্যবস্থাপনায় বাসযোগ্য রাখা যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ।

আবাসন খাতের বিবর্তনে বেসরকারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যেখানে সরকারি কলোনি ছিল প্রধান আবাসন ব্যবস্থা, এখন সেখানে কয়েকশ এমনকি পাঁচশ বা হাজার পরিবারের জন্য বড় আবাসন কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে। শহরের ভেতরে বড় জায়গা না পাওয়ায় এই প্রকল্পগুলো শহরের প্রান্তে সরে যাচ্ছে, ফলে সেখানে নতুন রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এই অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে এলেও মূলত সাধারণ মানুষের চাহিদাই এই খাতের চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে শহরের সম্প্রসারণও পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না।

পরিবেশবান্ধব বা সবুজ আবাসন নিয়ে আমাদের এখনই বেশি মনোযোগী হতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো আবাসন খাতেও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক কোম্পানি এখন নিজস্ব উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে একটি পরিবেশবান্ধব ভবনে নকশাগত কৌশলের মাধ্যমে সাধারণ ভবনের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। সঠিক আলো-বাতাসের ব্যবহার এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এয়ারকন্ডিশনিংয়ের ওপর চাপ কমিয়ে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো যায়।

একটি টেকসই আবাসন মানে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় নয়; এটি সামাজিক ও নাগরিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়। পরিকল্পিত এলাকা যেমন ধানমন্ডি বা উত্তরায় যে সুবিধা আছে, অপরিকল্পিত এলাকায় রাস্তা সরু এবং খোলা জায়গা কম। বিশেষ করে এক-দেড় কাঠার জমির ওপর একের পর এক ভবন তৈরির ফলে জনপরিসর সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হারিয়ে যাওয়া পুকুর, মাঠ বা জলাভূমি উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন ছোট ছোট মাঠ ও হাঁটার পথ তৈরি করতে হবে। শহরের সরকারি পরিত্যক্ত জায়গাগুলো জনস্বার্থে ব্যবহার করলে বাসযোগ্যতা অনেক বাড়বে।

নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাপনায় রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের মতো সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক হওয়া উচিত নয়। তাদেরকে বরং উন্নয়নের সহায়ক অংশীদার হতে হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাধার মুখেও মানুষ নিজের উদ্যোগে এগিয়ে গেছেন। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, যাতে তারা সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তার মাধ্যমে উন্নয়নকে টেকসই করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—সীমিত ভূমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য কীভাবে বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগরজীবন নিশ্চিত করা যায়। তাই পুরনো নগরায়ণ দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণই হবে টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি। এই উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, সে প্রশ্ন থাকতেই পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

শহরের চাপ সামলাতে প্রয়োজন নতুন নগরায়ণ দর্শন

আপলোডের সময় : 10:21:06 am, Wednesday, 14 October 2026

গত তিন-চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্রটি স্পষ্ট, যদিও এর সুফল কতটা সমবণ্টন হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এই অগ্রগতির সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটেছে আবাসন ও ভবন নির্মাণ শিল্পে। এখন শহর তো বটেই, গ্রামেও স্থায়ী পাকা ভবন নির্মাণের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। মানুষ কর্মসংস্থান বা প্রবাস থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে গ্রামে স্থায়ী বাড়ি করতে চাচ্ছেন, যা একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান কৃষিজমি ও ধানি জমি আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি মৌলিক বসতি পরিকল্পনা থাকলে এই উন্নয়ন অনেক বেশি শৃঙ্খলিত করা যেত, যা এখনও কিছুটা হলেও সম্ভব। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে বেড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। বিদেশে বা শহরে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পর অনেকেই গ্রামে নিজেদের একটি স্থায়ী বাড়ি করতে চান। আমরা নগর–পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু গ্রামীণ পরিকল্পনা নিয়ে কম ভাবি। অথচ বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করেন। এখনো সেই সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। শহর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় মানুষ কাজ, শিক্ষা ও জীবিকার জন্য শহরমুখী হচ্ছেন।

আমাদের নগরায়ণের মূল সমস্যা হলো শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ। মানুষ কাজের খোঁজে শহরমুখী হওয়ায় ঢাকার মতো শহরগুলো এই বিপুল চাপ নিতে পারছে না। ঢাকায় একজন সাধারণ কর্মী ৮০০, ১০০০ বা ১২০০ বর্গফুটের ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে চাইলেও গত ৫০ বছরে আমরা সেই চাহিদামতো পরিকল্পিত আবাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে পারিনি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ শহরে বাস করে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে যে ভবিষ্যতে আমাদের শহরে উঁচু ভবন ও উচ্চ ঘনত্বের জনবসতিই মূলধারা হবে। ঘনত্ব নিজেই সমস্যা নয়, বরং তাকে কীভাবে সৃজনশীল ব্যবস্থাপনায় বাসযোগ্য রাখা যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ।

আবাসন খাতের বিবর্তনে বেসরকারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যেখানে সরকারি কলোনি ছিল প্রধান আবাসন ব্যবস্থা, এখন সেখানে কয়েকশ এমনকি পাঁচশ বা হাজার পরিবারের জন্য বড় আবাসন কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে। শহরের ভেতরে বড় জায়গা না পাওয়ায় এই প্রকল্পগুলো শহরের প্রান্তে সরে যাচ্ছে, ফলে সেখানে নতুন রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এই অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে এলেও মূলত সাধারণ মানুষের চাহিদাই এই খাতের চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে শহরের সম্প্রসারণও পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না।

পরিবেশবান্ধব বা সবুজ আবাসন নিয়ে আমাদের এখনই বেশি মনোযোগী হতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো আবাসন খাতেও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক কোম্পানি এখন নিজস্ব উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে একটি পরিবেশবান্ধব ভবনে নকশাগত কৌশলের মাধ্যমে সাধারণ ভবনের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। সঠিক আলো-বাতাসের ব্যবহার এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এয়ারকন্ডিশনিংয়ের ওপর চাপ কমিয়ে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো যায়।

একটি টেকসই আবাসন মানে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় নয়; এটি সামাজিক ও নাগরিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়। পরিকল্পিত এলাকা যেমন ধানমন্ডি বা উত্তরায় যে সুবিধা আছে, অপরিকল্পিত এলাকায় রাস্তা সরু এবং খোলা জায়গা কম। বিশেষ করে এক-দেড় কাঠার জমির ওপর একের পর এক ভবন তৈরির ফলে জনপরিসর সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হারিয়ে যাওয়া পুকুর, মাঠ বা জলাভূমি উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন ছোট ছোট মাঠ ও হাঁটার পথ তৈরি করতে হবে। শহরের সরকারি পরিত্যক্ত জায়গাগুলো জনস্বার্থে ব্যবহার করলে বাসযোগ্যতা অনেক বাড়বে।

নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাপনায় রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের মতো সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক হওয়া উচিত নয়। তাদেরকে বরং উন্নয়নের সহায়ক অংশীদার হতে হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাধার মুখেও মানুষ নিজের উদ্যোগে এগিয়ে গেছেন। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, যাতে তারা সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তার মাধ্যমে উন্নয়নকে টেকসই করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—সীমিত ভূমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য কীভাবে বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগরজীবন নিশ্চিত করা যায়। তাই পুরনো নগরায়ণ দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণই হবে টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি। এই উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, সে প্রশ্ন থাকতেই পারে।