
দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেই তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে ৬০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফডি ক্ষমতার এই টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ (সিএনইই)। কোম্পানিটি ‘বিল্ড-ওন-অপারেট’ (বিওও) মডেলের অধীনে ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার রিগ্যাসিফিকেশন ফি দাবি করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রস্তাবিত ফি বর্তমান বাজারের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি। বিদ্যমান চুক্তিতে এক্সিলারেট এনার্জি দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনাল ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার ফি পাচ্ছে। এমনকি ২০২৪ সালের মার্চে বাতিল হওয়া সামিটের টার্মিনালের জন্য পেট্রোবাংলা যে দৈনিক ৩ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করেছিল, নতুন এই চীনা প্রস্তাব তার চেয়েও অনেক বেশি। এছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সুপারিশকৃত দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের বেঞ্চমার্ককেও এই প্রস্তাব ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন সেবার জন্য একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে পরিশোধিত ব্যয়ের চেয়ে ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ফি দিতে যাচ্ছে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, সিএনইই-র দাবি করা ফি এক্সিলারেট এনার্জির দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার ফির তুলনায় বহুগুণ বেশি।
চুক্তির কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। আগের প্রকল্পগুলো ‘বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার’ (বিওওটি) মডেলে হলেও, এটি করা হচ্ছে বিওও মডেলে। এর ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদের পর টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার হাতে আসার সুযোগ থাকছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও দরকষাকষির বিভিন্ন ধাপে সিএনইই তাদের প্রাথমিক দাবি ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার থেকে কিছুটা কমিয়েছে, তবুও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের কমিটি ১৫ বছরে ৩ লাখ ৪২ হাজার অথবা ২০ বছরে ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ফি গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এ চুক্তির মোট দায়বদ্ধতা প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সমালোচকরা বলছেন, কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই বিশাল চুক্তি সম্পন্ন করা এবং এই খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার অজুহাত দিলেও এমন বড় সিদ্ধান্তের আগে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কাতার এনার্জি সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ায় দেশে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। এর ফলে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে টার্মিনাল নির্মাণে বাড়তি খরচের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে অর্থনীতিকে।
প্রতিনিধির নাম 

























