হামের প্রকোপ: টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব টিকাদান কর্মসূচির বড় ধরনের ব্যর্থতা ও ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও, কেবল এ বছরই দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম এক সময় বিশ্বে প্রশংসিত হলেও, বর্তমানে এটি গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক গাফিলতি ও পরিকল্পনার অভাবে দেশের শিশুরা আজ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, শিশুদের টিকাদানের ক্ষেত্রে পরপর কয়েকটি সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও গাফিলতির মূল্য জীবন দিয়েই চুকাতে হচ্ছে আমাদের শিশুদের। অথচ টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম বিশ্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত ছিল। প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশে কেন হামের প্রকোপ কমছে না, তা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে শিশুদের হামের টিকাদানে ব্যর্থতা পেয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন দল।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভির প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিআইয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে, শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে বিলম্বই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। বর্তমানে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গৃহীত সরকারি পদক্ষেপগুলোকেও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞ দলের মতে, এই দুর্বলতা দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি এমনকি পোলিও ছড়িয়ে পড়ার মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হার প্রয়োজন। অথচ ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার কমে যথাক্রমে ৯০ ও ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় টিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা অনেক শিশুই পায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম থেকে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল—এই পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে আট লাখ শিশু হামের টিকা পায়নি, যা টিকাদান ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। দুই ডোজ টিকাই শিশুকে এই রোগের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। স্বাধীন এই বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, সব মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাতে না পারা এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

টিকাদান কর্মসূচির কোল্ড চেইন বা হিমায়িত সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যার ফলে টিকার গুণমান বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। এছাড়া আশির দশকের পুরনো জনবল কাঠামো ও লজিস্টিক সাপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা আধুনিক সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া টিকাদান লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো অসম্ভব।

এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে টিকা কর্মসূচি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে টিকার সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা, পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং শহরের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও দুর্গম এলাকার শিশুদের শতভাগ টিকার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। পাশাপাশি টিকার সঙ্গে শিশুদের পুষ্টির বিষয়টিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহর অঞ্চলের গরিব শিশু ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুরা যাতে কোনোভাবেই টিকার বাইরে না থাকে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

হামের প্রকোপ: টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন

আপলোডের সময় : 10:03:48 am, Sunday, 18 October 2026

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব টিকাদান কর্মসূচির বড় ধরনের ব্যর্থতা ও ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও, কেবল এ বছরই দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম এক সময় বিশ্বে প্রশংসিত হলেও, বর্তমানে এটি গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক গাফিলতি ও পরিকল্পনার অভাবে দেশের শিশুরা আজ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, শিশুদের টিকাদানের ক্ষেত্রে পরপর কয়েকটি সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও গাফিলতির মূল্য জীবন দিয়েই চুকাতে হচ্ছে আমাদের শিশুদের। অথচ টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম বিশ্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত ছিল। প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশে কেন হামের প্রকোপ কমছে না, তা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে শিশুদের হামের টিকাদানে ব্যর্থতা পেয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন দল।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভির প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিআইয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে, শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে বিলম্বই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। বর্তমানে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গৃহীত সরকারি পদক্ষেপগুলোকেও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞ দলের মতে, এই দুর্বলতা দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি এমনকি পোলিও ছড়িয়ে পড়ার মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হার প্রয়োজন। অথচ ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার কমে যথাক্রমে ৯০ ও ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় টিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা অনেক শিশুই পায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম থেকে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল—এই পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে আট লাখ শিশু হামের টিকা পায়নি, যা টিকাদান ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। দুই ডোজ টিকাই শিশুকে এই রোগের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। স্বাধীন এই বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, সব মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাতে না পারা এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

টিকাদান কর্মসূচির কোল্ড চেইন বা হিমায়িত সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যার ফলে টিকার গুণমান বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। এছাড়া আশির দশকের পুরনো জনবল কাঠামো ও লজিস্টিক সাপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা আধুনিক সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া টিকাদান লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো অসম্ভব।

এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে টিকা কর্মসূচি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে টিকার সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা, পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং শহরের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও দুর্গম এলাকার শিশুদের শতভাগ টিকার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। পাশাপাশি টিকার সঙ্গে শিশুদের পুষ্টির বিষয়টিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহর অঞ্চলের গরিব শিশু ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুরা যাতে কোনোভাবেই টিকার বাইরে না থাকে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।