
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ার রাজপথে শিক্ষার্থীরা এবং সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের সংকট নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বিক্ষোভের ধরন দেশভেদে ভিন্ন হলেও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অভাবের মতো বিষয়গুলো আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও শান্তিপূর্ণ মিছিল আবার কোথাও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। সব মিলিয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্থানীয় সমস্যা সামনে এলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে।
ফ্রান্সে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সেপ্টেম্বরের শেষে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পরপরই।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, দীর্ঘ ক্লাস, শিক্ষকের তীব্র সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জটিল পদ্ধতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।
এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষও বাঁধে। পরিস্থিতি সামলাতে সরকার তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান শ্রমিক সংগঠন ‘জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার’ (সিজিটি) এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দ্রব্যমূল্য কমানো ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলেছে। ২০২৭ সালের এপ্রিলে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। শিক্ষক পদে শূন্যতা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত কয়েক মাস পর্যন্ত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সরকার আরো ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।
স্পেনে আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভের বড় কারণ ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালের উচ্ছেদ ও মৃত্যু। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার বাড়ির ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় এই বৃদ্ধাকে বাড়ি ছাড়তে হয়, যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। স্পেনে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া আবাসন খরচ নিয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিকরা উচ্ছেদ বন্ধ ও বিনিয়োগ তহবিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় আইন পাশের চেষ্টা করলেও বিরোধী দলের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। এখন ২৯ নভেম্বরের আগাম নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে দেশটি। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থি ও উগ্রডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস হয়নি। এরপর ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দেন সানচেজ। সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—দুই পক্ষই আগামী নির্বাচনে জিতলে আরো বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসন সংকট সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পর্তুগালের আবাসন সংকটও তীব্র। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে বাড়ির দাম ১২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের দ্বিগুণ। রাজধানী লিসবনের রাস্তায় শনিবার জড়ো হওয়া শত শত মানুষ আবাসনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। অন্যদিকে, ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারীরা পুলিশের দিকে পাথর ও পেভমেন্টের ব্লক ছুড়ে মারে এবং রাস্তা অবরোধ করতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বেলজিয়ামেও ফ্রান্সের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা জানিয়ে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। সংস্কার কার্যকর করতে তার আরো বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর, পেভমেন্টের ব্লকসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন।
আলবেনিয়ায় টানা ছয় দিন ধরে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। গত গ্রীষ্মে দেশটির উপকূলে শুরু হওয়া একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক থেকেই মূলত এই ক্ষোভের সূত্রপাত। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট এই আবাসন প্রকল্প দেশটির সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে এবং স্থানীয়দের স্বার্থের পরিপন্থি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায় চলছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান তিনি।
ফরাসি সরকারের দাবি, তারা শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি মেনে নিয়েছে; যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাতিল করা এবং নির্দিষ্ট শিল্পে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানো। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ কঠোর অবস্থানে থেকে সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থি ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি কার্যকর সংস্কারের পথে না হাঁটে, তবে বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ আরও জটিল হতে পারে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর।
ইউরোপজুড়ে এই তরুণদের আন্দোলনের একটি সাধারণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তা হলো উন্নত ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা। কেবল ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বরং স্পেনের আবাসন কিংবা আলবেনিয়ার দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রতিটি কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের বঞ্চনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। সরকারগুলো আগামী নির্বাচনের আগে এসব সংকট নিরসনে কতটুকু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতির মোড় কোন দিকে যাবে। নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে আবাসনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনের বিক্ষোভ কমতে পারে।
প্রতিনিধির নাম 

























