জমি দান বা হেবা: করের হিসাব ও আইনগত প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে পরিবারে জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দান বা হেবা পদ্ধতি বহুল প্রচলিত। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে করের দায় রয়েছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে মনে করেন পারিবারিক দান মানেই সব ক্ষেত্রে করমুক্ত, আবার কারও ধারণা হেবা করলেই বাড়তি কর দিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে করের বিষয়টি নির্ভর করে সম্পত্তির প্রকৃতি, লেনদেনের ধরন এবং বিদ্যমান আইনের ওপর। আয়কর ও দানকরের হিসাব আলাদা হওয়ায় এগুলোর প্রয়োগবিধি জানা জরুরি।

অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইন ২০২৩-এর ১২৫ ধারায় (২ক) উপধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি দান বা হেবা করা হলে এবং সেখানে দানকর আইন ১৯৯০ প্রযোজ্য হলে, সাব-রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ-চালানের মাধ্যমে সেই দানকর সংগ্রহ করবেন। এর ফলে আলাদা করে উৎসে কর সংগ্রহের আর কোনো প্রয়োজন থাকছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ৭ জুলাই এক স্পষ্টীকরণে জানিয়েছে যে, এই নিয়মটি শুধু হেবা বা দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়।

দানকর আইন ১৯৯০-এর ২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও প্রতিদানহীনভাবে অন্য কাউকে নগদ টাকা, জমি, ফ্ল্যাট বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তাকে ‘দান’ হিসেবে গণ্য করা হয়। দলিলে দানের নাম ‘উপহার’ বা ‘হেবা’ যা-ই হোক না কেন, লেনদেনের প্রকৃত চরিত্রই এখানে মুখ্য। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, ১ জুলাই ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রদত্ত সকল দানের ওপর নির্ধারিত হারে কর প্রযোজ্য, যদি না সেই দানে কোনো আইনি অব্যাহতি থাকে। মনে রাখতে হবে, দানকর মূলত দানকারীর দায়িত্ব, আর দানগ্রহীতার আয়কর দায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।

আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে দানকর থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। যেমন—বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া দান, এবং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা দুর্যোগ তহবিলে করা দান করমুক্ত। এ ছাড়া নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিয়েতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকার দান, বিমা পলিসি, উইল এবং মৃত্যুশয্যায় করা দানও করের আওতামুক্ত। পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী ও আপন ভাই-বোনকে করা দানও দানকর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এসবের বাইরে যেকোনো ব্যক্তি প্রতি অর্থবছরে মোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করলে তা করমুক্ত থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, দাদা-নাতি, চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগনে বা বন্ধুদের মধ্যে করা দান স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়, যদি না বিশেষ কোনো আইনি অব্যাহতি থাকে।

সম্পত্তি দান করার ক্ষেত্রে করযোগ্য মূল্যের বিষয়টি দানকর আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত হয়েছে। দান করা অ-নগদ সম্পত্তির মূল্য হিসেবে সেই তারিখে ওই সম্পত্তির খোলাবাজার মূল্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে দলিলের গায়ে নামমাত্র কম মূল্য লেখা থাকলেও কর নির্ধারণের সময় খোলাবাজারের মূল্যই গণ্য হবে। যদি বাজারমূল্য নির্ধারণ সম্ভব না হয়, তবে বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে তা নিরূপণ করা হয়।

দানকরের হার ধাপভিত্তিক। কোনো দানের প্রথম ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এর পরের ২০ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট অংশের ওপর ২০ শতাংশ হারে দানকর প্রযোজ্য। এই হারগুলো পুরো সম্পত্তির ওপর একবারে প্রয়োগ না করে ধাপ অনুযায়ী হিসাব করতে হয়। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি করযোগ্য দান করলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারের কাছে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কর কমিশনার প্রয়োজন মনে করলে নোটিশ দিয়ে রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। তবে প্রয়োজন বা যুক্তিসংগত কারণ থাকলে উপ–কর কমিশনার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে পারবেন।

আয়কর ও দানকর দুটি পৃথক করব্যবস্থা। আয়কর আইন ২০২৩-এর ৬৬ ধারা অনুযায়ী, উপহার বা দান ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে গণ্য হয়। দানকর পরিশোধ করলেই যে গ্রহীতা আয়কর থেকে মুক্তি পাবেন—বিষয়টি তেমন নয়। তবে ষষ্ঠ তফসিলে স্পষ্ট বলা আছে, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান গ্রহীতার জন্য আয়করমুক্ত, যদি উভয়ের রিটার্নে সেই দান প্রদর্শিত থাকে। বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয় ব্যাংকিং চ্যানেলে দান পাঠালে তা আয়করমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রিটার্নে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ–১–এর দফা ৩৫ অনুযায়ী, স্বামী–স্ত্রী, আপন ভাই–বোন, মাতা–পিতা ও সন্তানের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান আয়করমুক্ত, যদি উভয়ের রিটার্নে তা প্রদর্শিত হয়।

উপসংহারে বলা যায়, হেবা মুসলিম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-তে স্বীকৃত। তবে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিলের নাম নয়, বরং লেনদেনের আর্থিক ও আইনগত চরিত্রই প্রধান ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে দানকর আইনের আওতা ও অব্যাহতির শর্তগুলো যাচাই করা করদাতা হিসেবে অত্যন্ত জরুরি। ফয়সাল ইসলাম, ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

জমি দান বা হেবা: করের হিসাব ও আইনগত প্রক্রিয়া

আপলোডের সময় : 09:17:51 am, Monday, 19 October 2026

বাংলাদেশে পরিবারে জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দান বা হেবা পদ্ধতি বহুল প্রচলিত। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে করের দায় রয়েছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে মনে করেন পারিবারিক দান মানেই সব ক্ষেত্রে করমুক্ত, আবার কারও ধারণা হেবা করলেই বাড়তি কর দিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে করের বিষয়টি নির্ভর করে সম্পত্তির প্রকৃতি, লেনদেনের ধরন এবং বিদ্যমান আইনের ওপর। আয়কর ও দানকরের হিসাব আলাদা হওয়ায় এগুলোর প্রয়োগবিধি জানা জরুরি।

অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইন ২০২৩-এর ১২৫ ধারায় (২ক) উপধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি দান বা হেবা করা হলে এবং সেখানে দানকর আইন ১৯৯০ প্রযোজ্য হলে, সাব-রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ-চালানের মাধ্যমে সেই দানকর সংগ্রহ করবেন। এর ফলে আলাদা করে উৎসে কর সংগ্রহের আর কোনো প্রয়োজন থাকছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ৭ জুলাই এক স্পষ্টীকরণে জানিয়েছে যে, এই নিয়মটি শুধু হেবা বা দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়।

দানকর আইন ১৯৯০-এর ২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও প্রতিদানহীনভাবে অন্য কাউকে নগদ টাকা, জমি, ফ্ল্যাট বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তাকে ‘দান’ হিসেবে গণ্য করা হয়। দলিলে দানের নাম ‘উপহার’ বা ‘হেবা’ যা-ই হোক না কেন, লেনদেনের প্রকৃত চরিত্রই এখানে মুখ্য। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, ১ জুলাই ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রদত্ত সকল দানের ওপর নির্ধারিত হারে কর প্রযোজ্য, যদি না সেই দানে কোনো আইনি অব্যাহতি থাকে। মনে রাখতে হবে, দানকর মূলত দানকারীর দায়িত্ব, আর দানগ্রহীতার আয়কর দায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।

আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে দানকর থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। যেমন—বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া দান, এবং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা দুর্যোগ তহবিলে করা দান করমুক্ত। এ ছাড়া নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিয়েতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকার দান, বিমা পলিসি, উইল এবং মৃত্যুশয্যায় করা দানও করের আওতামুক্ত। পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী ও আপন ভাই-বোনকে করা দানও দানকর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এসবের বাইরে যেকোনো ব্যক্তি প্রতি অর্থবছরে মোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করলে তা করমুক্ত থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, দাদা-নাতি, চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগনে বা বন্ধুদের মধ্যে করা দান স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়, যদি না বিশেষ কোনো আইনি অব্যাহতি থাকে।

সম্পত্তি দান করার ক্ষেত্রে করযোগ্য মূল্যের বিষয়টি দানকর আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত হয়েছে। দান করা অ-নগদ সম্পত্তির মূল্য হিসেবে সেই তারিখে ওই সম্পত্তির খোলাবাজার মূল্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে দলিলের গায়ে নামমাত্র কম মূল্য লেখা থাকলেও কর নির্ধারণের সময় খোলাবাজারের মূল্যই গণ্য হবে। যদি বাজারমূল্য নির্ধারণ সম্ভব না হয়, তবে বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে তা নিরূপণ করা হয়।

দানকরের হার ধাপভিত্তিক। কোনো দানের প্রথম ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এর পরের ২০ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট অংশের ওপর ২০ শতাংশ হারে দানকর প্রযোজ্য। এই হারগুলো পুরো সম্পত্তির ওপর একবারে প্রয়োগ না করে ধাপ অনুযায়ী হিসাব করতে হয়। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি করযোগ্য দান করলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারের কাছে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কর কমিশনার প্রয়োজন মনে করলে নোটিশ দিয়ে রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। তবে প্রয়োজন বা যুক্তিসংগত কারণ থাকলে উপ–কর কমিশনার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে পারবেন।

আয়কর ও দানকর দুটি পৃথক করব্যবস্থা। আয়কর আইন ২০২৩-এর ৬৬ ধারা অনুযায়ী, উপহার বা দান ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে গণ্য হয়। দানকর পরিশোধ করলেই যে গ্রহীতা আয়কর থেকে মুক্তি পাবেন—বিষয়টি তেমন নয়। তবে ষষ্ঠ তফসিলে স্পষ্ট বলা আছে, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান গ্রহীতার জন্য আয়করমুক্ত, যদি উভয়ের রিটার্নে সেই দান প্রদর্শিত থাকে। বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয় ব্যাংকিং চ্যানেলে দান পাঠালে তা আয়করমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রিটার্নে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ–১–এর দফা ৩৫ অনুযায়ী, স্বামী–স্ত্রী, আপন ভাই–বোন, মাতা–পিতা ও সন্তানের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান আয়করমুক্ত, যদি উভয়ের রিটার্নে তা প্রদর্শিত হয়।

উপসংহারে বলা যায়, হেবা মুসলিম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-তে স্বীকৃত। তবে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিলের নাম নয়, বরং লেনদেনের আর্থিক ও আইনগত চরিত্রই প্রধান ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে দানকর আইনের আওতা ও অব্যাহতির শর্তগুলো যাচাই করা করদাতা হিসেবে অত্যন্ত জরুরি। ফয়সাল ইসলাম, ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক।