
উন্নত জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন মো. আলী হাসান সোহেল ও মো. পলাশ শেখসহ ৩০ জনের একটি দল। মো. আলী হাসান সোহেলের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায়। আলী হাসান আরও বলেন, ‘এক বছরে পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারব কি না জানি না। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা বলছেন, ওই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। সেটি মাটির নিচের একটি সেনা ক্যাম্প।
বর্তমানে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আলী হাসান।
গত ১ মাস ১০ দিন ধরে তিনি সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আলী হাসান বলেন, ‘এ জীবন কেউ চায় না। এটা কোনো জীবন না। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু সুস্থ হলে তাদের আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আশঙ্কার কথা মনে করে তিনি আতঙ্কিত। সুস্থতার অপেক্ষায় থাকা এই যুবক পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানানোর পাশাপাশি নিজেকে উদ্ধার করার অনুরোধ করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে আগামী এক বছরেও হয়তো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। গতকাল বুধবার তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। পরিবারটির শেষ আশা, পবিত্র বেঁচেও থাকতে পারেন। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে।
একইভাবে গুরুতর আহত অবস্থায় মস্কোর একটি হাসপাতালে গত ২৪ দিন ধরে ভর্তি আছেন গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ। ড্রোন হামলায় তার একটি হাত উড়ে গেছে। পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম জানিয়েছেন, যেহেতু তার একটি হাত নেই, সেহেতু তাকে আবারও যুদ্ধের মাঠে পাঠানোর সম্ভাবনা কম। পলাশ যেকোনো উপায়ে দেশে ফিরতে চান। তার বোন চুমকি খানম গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পলাশকে উদ্ধার ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গত ৭ মে রাশিয়ায় পাড়ি জমান পলাশ, কিন্তু সেখানে তাকে প্রতারণার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। কবে দেশে ফিরতে পারব, এই প্রার্থনা করি সারাক্ষণ।
আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুনও গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একই ধরনের আবেদন করেছেন। আবেদনে জানানো হয়, আলী হাসান পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন এবং প্রতারিত হয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে বাধ্য হয়ে যোগ দিতে হয়েছে। বর্তমানে তার পরিবার ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পাওনাদারদের তীব্র চাপের মুখে আছে। আবেদনের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগে আলী হাসানকে উদ্ধার ও পরিবারকে আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও যোগ দেন।
রাশিয়ায় গিয়ে ভুক্তভোগী ৩০ জনের ১৫ জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ৭ মে তারা দেশ ছাড়লেও সেখানে প্রতিশ্রুত কোনো চাকরি পাননি। তাদের প্রতারণাপূর্বক যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়েছে। এই দলের অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যারা বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে ৬ জন যুদ্ধক্ষেত্রে, দুজন পালিয়ে দেশে ফিরেছেন এবং আলী হাসান ও পলাশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে গত ৭ মে একসঙ্গে রাশিয়ায় যান ৩০ জন। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। এদের অনেকেই গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন মূলত ‘টোপ’ হিসেবে। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ, যার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।
যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আলী হাসান জানান, মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের পরই তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। শুকনো খাবার খেয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে তারা একটি সুড়ঙ্গে আশ্রয় নেন। সেখানে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের প্রলুব্ধ করা হয় এভাবে যে, ‘যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু সামনে-পিছে আর ডানে-বাঁয়ে যাবা।’ কিন্তু এটি ছিল মরণফাঁদ। রাজি না হলে বন্দী করে মারধর করা হতো। ১৬ জনের সেই দলের ১৪ জনই এখন নিখোঁজ। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
রাশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে থাকা কোনো ব্যক্তি দেশে ফেরার জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ করেননি। অন্যদিকে, অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, রাশিয়ার সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ দূতাবাসকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি রাশিয়া কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং সুস্থ হওয়ামাত্র দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাশিয়ায় নিহতদের মরদেহ সাধারণত বাংলাদেশে আসে না এবং পরিবারগুলোও কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে, আমার মাকে দেখে রাখিস’। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে। গেলেই ইউক্রেনের ড্রোনের হামলার শিকার হতে হয়। বাংলাদেশ থেকে ২০২৩ সালে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়।
প্রতিনিধির নাম 

























