ময়মনসিংহে এনসিডি কর্নারে ওষুধের সংকট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত ‘নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ’ বা এনসিডি কর্নারে দেখা দিয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা নিয়মিত ওষুধ না পাওয়ায় তাদের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে রোগীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষের আয়ু বৃদ্ধি, জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)।

দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যুই হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কর্নার চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের নিজ এলাকার কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং ওষুধের নিশ্চয়তা প্রদান করা। এতে রোগ জটিল পর্যায়ে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রোগীরা সময়মতো ফলোআপে আসছেন এবং তাদের কন্ট্রোল রেটও ভালো পর্যায়ে রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এনসিডি কর্নারে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এই সেবা কার্যক্রমকে টেকসই ও কার্যকর করতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, রোগীদের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক শিক্ষার ওপরও সমান গুরুত্বারোপ করতে হবে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসাইন জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী সরকারি ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই মজুদ এখন প্রায় শেষের পথে। তিনি বলেন, এনসিডি কর্নারগুলো চালুর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা পেয়ে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে পারছিলেন। তবে ওষুধের ধারাবাহিকতা না থাকলে এই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হবে।

হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত ফলোআপের জন্য তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। তার ভাষ্যমতে, আগে এলাকায় চিকিৎসার এমন সুব্যবস্থা ছিল না। এখন রক্তচাপ মাপার পাশাপাশি নিয়মিত পরামর্শ পাচ্ছেন। তবে ওষুধের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের নতুন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা জানান, বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফান্ড ব্যবহার করে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এমএসআর ফান্ডের অর্থের একটি বড় অংশ হাসপাতালের ইনডোরসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনতে ব্যয় করতে হয়। এর ফলে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধের জোগান দেওয়া কর্মকর্তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা আরও বলছেন, এনসিডি কর্নারগুলোকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা থাকলেও জনবল সংকট এবং রক্তচাপ মাপার যন্ত্র বা গ্লুকোজ পরীক্ষার উপকরণের অপ্রতুলতা কার্যক্রমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগী শনাক্ত ও নিবন্ধনের পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে ময়মনসিংহের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই প্রকল্পের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

ময়মনসিংহে এনসিডি কর্নারে ওষুধের সংকট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপলোডের সময় : 11:07:32 am, Thursday, 1 October 2026

ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত ‘নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ’ বা এনসিডি কর্নারে দেখা দিয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা নিয়মিত ওষুধ না পাওয়ায় তাদের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে রোগীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষের আয়ু বৃদ্ধি, জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)।

দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যুই হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কর্নার চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের নিজ এলাকার কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং ওষুধের নিশ্চয়তা প্রদান করা। এতে রোগ জটিল পর্যায়ে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রোগীরা সময়মতো ফলোআপে আসছেন এবং তাদের কন্ট্রোল রেটও ভালো পর্যায়ে রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এনসিডি কর্নারে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এই সেবা কার্যক্রমকে টেকসই ও কার্যকর করতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, রোগীদের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক শিক্ষার ওপরও সমান গুরুত্বারোপ করতে হবে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসাইন জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী সরকারি ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই মজুদ এখন প্রায় শেষের পথে। তিনি বলেন, এনসিডি কর্নারগুলো চালুর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা পেয়ে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে পারছিলেন। তবে ওষুধের ধারাবাহিকতা না থাকলে এই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হবে।

হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত ফলোআপের জন্য তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। তার ভাষ্যমতে, আগে এলাকায় চিকিৎসার এমন সুব্যবস্থা ছিল না। এখন রক্তচাপ মাপার পাশাপাশি নিয়মিত পরামর্শ পাচ্ছেন। তবে ওষুধের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের নতুন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা জানান, বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফান্ড ব্যবহার করে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এমএসআর ফান্ডের অর্থের একটি বড় অংশ হাসপাতালের ইনডোরসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনতে ব্যয় করতে হয়। এর ফলে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধের জোগান দেওয়া কর্মকর্তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা আরও বলছেন, এনসিডি কর্নারগুলোকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা থাকলেও জনবল সংকট এবং রক্তচাপ মাপার যন্ত্র বা গ্লুকোজ পরীক্ষার উপকরণের অপ্রতুলতা কার্যক্রমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগী শনাক্ত ও নিবন্ধনের পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে ময়মনসিংহের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই প্রকল্পের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।