
পুলিশের সামনে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসাধারণের আস্থা অর্জন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনী বর্তমানে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাহিনীটিকে পুনরায় সক্রিয় করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আলোচিত এই চার ঘটনার কোনোটিই পুলিশ ঠেকাতে পারেনি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আইজিপি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের তুলনায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৮টি। অর্থাৎ নির্বাচিত সরকারের সময়ে মামলার সংখ্যা ১৪ হাজার ৮০২টি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের থানায় মামলা করার সুযোগ তৈরি হওয়া এবং পুলিশের মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানকে দায়ী করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ এক বছরের সঙ্গে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের এক বছরের তুলনা করলে দেশে ১০ ধরনের মধ্যে ৮ ধরনের (খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, পুলিশ আক্রান্ত ও দ্রুত বিচার আইনের মামলা) অপরাধ কমেছে। আমি মনে করি, মানুষ থানায় মামলা করার বেশি সুযোগ পাওয়ায় এবং পুলিশের অভিযানে মাদক দ্রব্য বেশি উদ্ধার হওয়ায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
রাজধানীর মিরপুর ও এর আশপাশের এলাকায় জমি ও বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মিরপুর-১ নম্বরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনাগুলো পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইজিপি স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো ধরনের জমি বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি কেবল আইন অনুযায়ী হবে, কোনো ধরনের পেশিশক্তি প্রয়োগের সুযোগ নেই। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে, এরপর ইসিবি চত্বরের কাছে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। একইভাবে বাড়ি ও জমি দখলের উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে আদাবর ও মোহাম্মদপুরে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অপরাধ দমনে পুলিশ এখন ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ বা প্রতিরোধমূলক পদ্ধতির ওপর জোর দিচ্ছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা বা ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, বরং অপরাধের হার কমানো এবং অপরাধীদের বারবার অপরাধে জড়ানো রোধ করাই পুলিশের মূল লক্ষ্য। তবে এটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর গৃহীত আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশের সব মডেল ও সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেন’ বা অভিযোগশূন্য থানা হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। তিনি বলেন, থানায় সেবা নিতে আসা সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদের অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাই পুলিশের অন্যতম প্রধান কাজ। থানাকে জনগণের আস্থার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ওসিদের জনবান্ধব হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজিপি জানিয়েছেন, গত জুলাই ও আগস্টের ঘটনাগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের সদস্যদের কল্যাণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক নজরুল ইসলাম।
তিনি আরও জানান, বাহিনীর ভেতর থেকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন আর পুলিশকে বেআইনি কোনো নির্দেশ দিচ্ছেন না। উগ্রবাদের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে উগ্রবাদের বড় কোনো বিস্তার নেই, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে যাতে কেউ বিপথগামী না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অপরাধের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পুলিশ নেতৃত্বের ঘাটতি চিহ্নিত করে নিয়মিত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রতিনিধির নাম 

























