
কখনো অন্যের বাড়িতে রাখাল, আবার কখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরে আচার-বাদাম বিক্রেতা—এভাবেই জীবন কাটছিল টাঙ্গাইলের সখীপুরের মোসলেম উদ্দিনের। অভাবের তাড়নায় পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়া মোসলেম আজ সফল কৃষিউদ্যোক্তা। সখীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০ একর জমি ইজারা নিয়ে গড়ে তুলেছেন আগাম জাতের টক বরইয়ের বিশাল বাগান। চলতি মৌসুমে বাগান থেকে কোটি টাকার বরই বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তিনি, যা থেকে সব খরচ বাদে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন এই সফল কৃষক।
মোসলেমের জীবনসংগ্রাম শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শেষে। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর সংসারের হাল ধরতে তিনি ফেরি করে আচার ও বাদাম বিক্রি করতেন। কখনো বিদ্যালয়ের সামনে, কখনো বাজারে ঘুরে ঘুরে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোরকমে দিনাতিপাত করতেন। ২০১০ সালে ১২ বছরের জন্য ছয় একর জমি ইজারা নিয়ে প্রথমবারের মতো লেবু চাষ শুরু করেন। লেবু চাষে সফলতা পাওয়ার পর তিনি নতুন কিছু করার চিন্তা শুরু করেন। বিশেষ করে নারীদের পছন্দের আচার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে টক বরইয়ের চাহিদা রয়েছে, এই বিষয়টি তাঁকে উৎসাহিত করে।
বর্তমানে মোসলেমের বরই চাষের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে ১০ একর এবং কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানী গ্রামের সাতটি স্থানে আরও ৪০ একর জমি ইজারা নিয়ে তিনি এই আবাদ করছেন। গত আগস্টের শুরু থেকেই বাগানের আগাম জাতের বরই বাজারে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন বাগান থেকে ৬০ কেজি ধারণক্ষমতার প্রায় ৮ থেকে ১০ বস্তা বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের আড়তে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বরই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ৭২ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকার বরই বিক্রি নিশ্চিত হচ্ছে।
বরইয়ের মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্রতিদিন দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গত মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টির কারণে ফুল ঝরে পড়ায় ফলন ব্যাহত হয়েছিল। তখন ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেও খরচ বাদে মাত্র ছয়-সাত লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় তিনি বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন। গত কয়েক দিনে এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই বাজারে পৌঁছেছে।
এই বরই চাষ কেবল মোসলেমের জীবনই বদলে দেয়নি, তৈরি করেছে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ। তাঁর বাগানে সারা বছর ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন, আর বরই পাড়ার মৌসুমে এই সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ জনে দাঁড়ায়। প্যাকেটজাত আচার তৈরির বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর বাগানের বড় ক্রেতা হওয়ায় বিক্রয় নিয়ে তাঁকে বাড়তি কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয় না। দারিদ্র্যের কশাঘাতে একসময় ছনের ঘরে থাকা মোসলেম এখন কৃষিকাজ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে গজারিয়া ইউনিয়নের ধুমখালী এলাকায় নিজ কেনা এক একর জমিতে তিনতলা ভবন নির্মাণ করেছেন।
তাঁর পরিবারের দুই ছেলের মধ্যে বড়জন তেজগাঁও কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করে মালয়েশিয়ার লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে সম্প্রতি সখীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। মোসলেমের এই সাফল্য দেখে স্থানীয় অনেক তরুণ ও কৃষক এখন বরই চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তিনি মনে করেন, সঠিক জাত নির্বাচন, পরিচর্যা ও সময়মতো বাজারজাত করতে পারলে যে কেউ এই পেশায় সফল হতে পারেন।
সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন জানান, মোসলেম আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সখীপুরের মাটি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, আর কৃষি বিভাগ সব সময় এমন উদ্যোক্তাদের মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। ৫০ একর জমির এই বাগান এখন আর কেবল ফলের আধার নয়, এটি মোসলেমের কঠোর পরিশ্রম ও বদলে যাওয়া জীবনের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে সংসার চলত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানুষের বাড়িতে থেকে গরু-বাছুর চরিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে টক বরইয়ের আচার নারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়—বিষয়টি তাঁর ভাবনায় বেশি ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ৫ সেপ্টেম্বর মোসলেমের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বড়ই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ গাছ থেকে বরই পাড়ছেন, কেউ ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কম হলেও তখন উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বরইগাছে ফুল আসার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন কমে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৫ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান বরইয়ের বাগান শুধু মোসলেমের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে।
প্রতিনিধির নাম 






















