দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে কাগজের কলম বানিয়ে স্বাবলম্বী শরিফুল

গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম জন্মগতভাবেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলা এই তরুণ নিজের মেধা ও ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। তিনি ঘরে বসেই পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম ও খাতা তৈরি করছেন, যা স্থানীয় বাজারে বেশ সমাদৃত। শরিফুল তাঁর এই উদ্ভাবনী পণ্যের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’।

শরিফুলের শিক্ষাজীবন বেশ সংগ্রামের। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার পর অডিও ও শ্রুতলেখকের সহায়তায় তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০২১ সালে স্নাতক ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। অর্থসংকটের কারণে পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি খাতা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কলম তৈরিতে রূপ নেয়।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে খাতা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি কাগজের কলম তৈরির ধারণা পান। যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে প্রযুক্তি শিখে নভেম্বর মাসে পুরোদমে উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে একটি কলম তৈরিতে তার খরচ হয় ৬ টাকা, যা ১০ টাকায় বিক্রি করেন। একইভাবে ১৫ টাকা খরচ করে খাতা তৈরি করে ২০ টাকায় বিক্রি করেন। দৈনিক গড়ে ৫০টি কলম ও ১০০টি খাতা তৈরির কাজে তাঁকে সহায়তা করেন স্ত্রী তানিয়া আকতার।

শরিফুলের পরিবারে রয়েছেন বাবা রফিকুল ইসলাম, মা মনোয়ারা বেগম এবং স্ত্রী তানিয়া। বাবা মুদি দোকানদার হলেও শরিফুলের ব্যবসার জন্য তিনি পুলবন্দি বাজারে ‘শরিফুল পেপার হাউস’ নামে ছোট একটি দোকান নিয়েছেন। দোকান ভাড়া ৫০০ টাকা দিয়েও মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়। সব খরচ মিটিয়ে তিন-চার হাজার টাকা আয় হলেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন, তাই বাবার আয়ের ওপরও তাদের কিছুটা নির্ভর করতে হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে শরিফুল ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকার তানিয়া আকতারকে বিয়ে করেন। স্বামীর এই কাজ নিয়ে গর্বিত তানিয়া সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলামের মতে, শরিফুল সমাজের বোঝা হয়ে থাকেননি, বরং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় শুরু হতে যাচ্ছে বাণিজ্যমেলা। এই মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন শরিফুল। গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টল থাকছে, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শরিফুল আশা করছেন, মেলায় নিজের পণ্যের প্রচার ও প্রসার আরও বাড়বে, যদিও মূলধনের অভাবে তিনি এখনো বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল (২৯)। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম (৭৬) মুদিদোকানি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ১০০টি কলম কিনে নেন শরিফুল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন কাগজ মেপে মেপে কাটছেন শরিফুল ইসলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাগজে আঠা লাগিয়ে ভেতরে কলমের শিষ ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি করছেন কলম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই বোন রাশেদা ও ফরিদার বিয়ে হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে কাগজের কলম বানিয়ে স্বাবলম্বী শরিফুল

আপলোডের সময় : 09:17:56 am, Saturday, 19 September 2026

গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম জন্মগতভাবেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলা এই তরুণ নিজের মেধা ও ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। তিনি ঘরে বসেই পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম ও খাতা তৈরি করছেন, যা স্থানীয় বাজারে বেশ সমাদৃত। শরিফুল তাঁর এই উদ্ভাবনী পণ্যের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’।

শরিফুলের শিক্ষাজীবন বেশ সংগ্রামের। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার পর অডিও ও শ্রুতলেখকের সহায়তায় তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০২১ সালে স্নাতক ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। অর্থসংকটের কারণে পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি খাতা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কলম তৈরিতে রূপ নেয়।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে খাতা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি কাগজের কলম তৈরির ধারণা পান। যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে প্রযুক্তি শিখে নভেম্বর মাসে পুরোদমে উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে একটি কলম তৈরিতে তার খরচ হয় ৬ টাকা, যা ১০ টাকায় বিক্রি করেন। একইভাবে ১৫ টাকা খরচ করে খাতা তৈরি করে ২০ টাকায় বিক্রি করেন। দৈনিক গড়ে ৫০টি কলম ও ১০০টি খাতা তৈরির কাজে তাঁকে সহায়তা করেন স্ত্রী তানিয়া আকতার।

শরিফুলের পরিবারে রয়েছেন বাবা রফিকুল ইসলাম, মা মনোয়ারা বেগম এবং স্ত্রী তানিয়া। বাবা মুদি দোকানদার হলেও শরিফুলের ব্যবসার জন্য তিনি পুলবন্দি বাজারে ‘শরিফুল পেপার হাউস’ নামে ছোট একটি দোকান নিয়েছেন। দোকান ভাড়া ৫০০ টাকা দিয়েও মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়। সব খরচ মিটিয়ে তিন-চার হাজার টাকা আয় হলেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন, তাই বাবার আয়ের ওপরও তাদের কিছুটা নির্ভর করতে হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে শরিফুল ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকার তানিয়া আকতারকে বিয়ে করেন। স্বামীর এই কাজ নিয়ে গর্বিত তানিয়া সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলামের মতে, শরিফুল সমাজের বোঝা হয়ে থাকেননি, বরং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় শুরু হতে যাচ্ছে বাণিজ্যমেলা। এই মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন শরিফুল। গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টল থাকছে, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শরিফুল আশা করছেন, মেলায় নিজের পণ্যের প্রচার ও প্রসার আরও বাড়বে, যদিও মূলধনের অভাবে তিনি এখনো বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল (২৯)। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম (৭৬) মুদিদোকানি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ১০০টি কলম কিনে নেন শরিফুল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন কাগজ মেপে মেপে কাটছেন শরিফুল ইসলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাগজে আঠা লাগিয়ে ভেতরে কলমের শিষ ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি করছেন কলম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই বোন রাশেদা ও ফরিদার বিয়ে হয়েছে।