
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ফেরদৌস রহমান বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রম (অফিস অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স) দপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরেও তিনি সিন্ডিকেট সদস্য, কর্মকর্তা নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সদস্য এবং কর্মচারী নিয়োগের আবেদন বাছাই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছেন। এক ব্যক্তির ওপর এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অন্তত ১০ জন শিক্ষক এ বিষয়টিকে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে করছেন।
ফেরদৌস রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণের কালপঞ্জি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি বহিরাঙ্গন কার্যক্রম দপ্তরের পরিচালক এবং ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নেন। আগামীকাল মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তাঁর প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুই বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায়, ৫ জানুয়ারি তাঁকে পরিচালক শ্রেণিতে সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত করা হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২১ নম্বর ধারার ১-এর (ট) উপধারায় সিন্ডিকেটের পরিচালক সদস্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, সিন্ডিকেটে জায়গা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক করা হয়েছিল। এ ছাড়া অধ্যাপক পদে তাঁর পদোন্নতি নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নীতিমালার শর্তানুযায়ী, অধ্যাপক হতে হলে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত পাঁচ বছরসহ মোট ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ ফেরদৌস রহমান ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। সেই হিসেবে ২০২৭ সালের আগে তাঁর অধ্যাপক হওয়ার কথা নয়। তবে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
পদোন্নতির এই বিশেষ সুবিধা প্রদানের পেছনে একটি বিতর্কিত সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তের কথা উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল ৯৪তম বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। এরপর ১০১তম সভায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ১১৫তম সিন্ডিকেট সভায় সেই সুবিধা আবার পুনর্বহাল করা হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফেরদৌস রহমান অতিরিক্ত প্রকাশনার জন্য এক বছরের রেয়াত গ্রহণ করেন। যদিও শিক্ষকদের দাবি, এই রেয়াত মোট অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে নয়।
তৎকালীন রেজিস্ট্রার হারুন অর রশিদের ভাষ্যমতে, ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে নিয়োগের সময় নীতিমালা মানা হয়নি। তিনি জানান, ১০১তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বাতিল দেখানোর যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেই সভায় এমন কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। সংস্থাপন শাখার তথ্যমতে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জন্য তিন বছরে সর্বোচ্চ এক বছরের রেয়াত পাওয়া যায়, অথচ সেই সময় তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল ১ বছর ৪ মাস ১১ দিন।
এই অনিয়ম নিয়ে রসায়ন বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল লতিফ বলেন, সব নিয়ম মেনে আবেদন করেও অনেক যোগ্য শিক্ষক পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হকের মতে, একজন ব্যক্তিকে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা বিরল ঘটনা এবং এটি নৈতিকতার পরিপন্থী। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফেরদৌস রহমান দাবি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার মধ্যেই সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিষয়টি নিয়ে ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই আইনে ‘পরিচালক’ বলতে ইনস্টিটিউটের পরিচালককে বোঝানো হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে ফেরদৌস রহমান ১ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে বলেন, ‘নীতিমালার বাইরে কোনো কিছুই হয়নি। চাকরির আরও তথ্য: তাঁকে নিয়োগ দিতে তখন ১০১তম সিন্ডিকেটের সভার একটি সিদ্ধান্ত পরের আরেকটি সিন্ডিকেটের সভার কার্যপত্র (রেজোল্যুশন) বাতিল দেখিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্য অধ্যাপকদের দায়িত্ব না দিয়ে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদ একজনের ধরে রাখার বিষয়টি নৈতিকতাবিরোধীও।’।
প্রতিনিধির নাম 























