
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য গাইনি চিকিৎসক না পাওয়ায় এক ভুক্তভোগীর আক্ষেপ পুরো স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কেবল এই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়, বরং সামগ্রিক প্রশাসনিক দুর্বলতা ও উন্নয়নের নামে কেবল অবকাঠামোর দিকে নজর দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ নাগরিকের দুর্ভোগকে দীর্ঘায়িত করছে। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের জন্য সামান্য দেরিও অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ১৪ বছরেও নিয়োগ সম্পন্ন হলো না, এতে বাংলাদেশের উন্নয়নের একটা প্রবণতাও স্পষ্ট হয়। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে, কিন্তু এসে শুনলেন এখানে গাইনি ডাক্তার নেই, অগত্যা ঝরে পড়ল খেদ, ‘আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে কীভাবে চিকিৎসা করাব। নাগরিকের এই খেদোক্তি নিঃসন্দেহে যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই দুঃখজনক, কিন্তু এই ডাক্তার না থাকার যে কারণ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০১২ সালে এই হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও উপযোগী জনবল নিয়োগের বিষয়টি ঝুলে আছে ১৪ বছর ধরে। বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬৭টি পদই শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসকের ৪১টি পদের মধ্যে ২৫টিই খালি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসূতি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের পদটিও শূন্য। জনবল সংকটের কারণে আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে মেশিনগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে এবং পুরো প্যাথলজি বিভাগ চলছে মাত্র একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ওপর ভর করে। জনবলের অভাবে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে না।
এ ধরনের সংকটের ফলে স্থানীয় দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে চা-বাগান এলাকার রোগীরা চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন। সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে জেলা হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন অথবা বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়বহুল খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে। জনবল নিয়োগের জন্য বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হলেও তাতে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। অথচ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোই এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভরসার প্রধান জায়গা। এই হাসপাতালে স্থানীয় বিভিন্ন চা-বাগানের দরিদ্র রোগীরাও আসে।
স্বাস্থ্য খাতের এই জনবলসংকট কেবল একটি উপজেলার চিত্র নয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৪১ হাজার ৮০৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১১ হাজার ৪৯৫টি পদই শূন্য। এই পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য খাতের সংকটের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট ও টেকনিশিয়ানসহ শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমেই নাগরিকদের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটানো সম্ভব। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৯৫ (, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
প্রতিনিধির নাম 

























