
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে প্রাণ রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এসব উদ্যোগ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমন হতাশাজনক পরিস্থিতির বিপরীতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা এলাকার বাসিন্দা আবদুল ছবুর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বজ্রপাত নিরোধের লক্ষ্য নিয়ে এ পর্যন্ত ২১ হাজার তালের বীজ রোপণ করেছেন। তালের বীজ রোপণ কর্মসূচি দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে, সেটাও আমরা দেখেছি।
এই মহতী উদ্যোগের পেছনের কারণটি বড়ই মর্মান্তিক। চার বছর আগে নিজের চোখের সামনেই ছেলের বন্ধুকে বজ্রপাতে প্রাণ হারাতে দেখেছিলেন ছবুর। সেই বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে নাড়া দেয়। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে নেমে পড়েন। পেশায় মোটর ওয়ার্কশপের মালিক আবদুল ছবুর ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। এই স্বল্প আয়ের মানুষটি কোনো প্রকার সরকারি সহায়তা বা প্রচারের প্রত্যাশা না করেই নিজ পকেটের টাকায় বীজ সংগ্রহ থেকে শুরু করে রোপণ পর্যন্ত সব কাজ সম্পন্ন করছেন। তাঁর লক্ষ্য ৩০ হাজার তালবীজ রোপণ করা, যার মধ্যে ২০ হাজারের বেশি বীজ ইতোমধ্যে রোপণ করা শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন জানাচ্ছে, চার বছর আগে নিজের চোখের সামনে ছেলের বন্ধুর বজ্রপাতে করুণ মৃত্যু দেখে ভেঙে পড়েছিলেন আবদুল ছবুর। সেই শোক ও ট্রমাকে নিছক বিষাদে বিলীন হতে না দিয়ে তিনি নেমে পড়েন মানুষের জীবনরক্ষার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে।
পরিবেশবিদদের মতে, তালগাছ বজ্রপাত থেকে রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এর উচ্চতা ও প্রাকৃতিক গঠন বজ্রপাতের তীব্রতা কমিয়ে দেয় এবং স্থানীয়দের জন্য আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। অথচ প্রতিবছর দুর্যোগ মোকাবিলার নামে যে বিশাল বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার অধিকাংশ অর্থই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও তদারকির অভাবে মাঠপর্যায়ে কোনো সুফল বয়ে আনে না। আবদুল ছবুরের এই নিঃশব্দ কর্মযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, জনকল্যাণমুখী কাজের জন্য বিশাল বাজেটের চেয়েও সদিচ্ছা অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বনায়ন দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন সাধারণ নাগরিকের এই প্রশংসনীয় কর্মযজ্ঞকে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দেওয়া স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ বিভাগের নৈতিক দায়িত্ব। যদি এসব গাছ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয়, তবে সঠিক তদারকির অভাবে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। আবদুল ছবুরের এই পরিবেশপ্রেম কেবল উপকূলীয় অঞ্চল আনোয়ারাকেই নিরাপদ করছে না, বরং রাষ্ট্রকে দেখাচ্ছে দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিক সচেতনতার নতুন পথ। এখন সময় এসেছে লোক দেখানো প্রকল্পের বাইরে এসে ছবুরের মতো মানুষের প্রকৃত উদ্যোগের পাশে টেকসইভাবে দাঁড়ানোর। পরিবেশের সুরক্ষায় নাগরিক দায়িত্ববোধের দারুণ প্রকাশ এটি।
প্রতিনিধির নাম 

























