তিন জোড়া কবুতর থেকে স্বাবলম্বী মৌলভীবাজারের স্বপ্না রানী

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামের গৃহবধূ স্বপ্না রানী সরকার (৪০) আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম। টিনশেডের আধাপাকা ঘরের আঙিনায় তার গড়ে তোলা ছোট্ট খামারে একঝাঁক মোরগ-মুরগি আর কবুতরের কলকাকলি মুখর থাকে সারাদিন। পাশাপাশি পুকুরপাড়ে একচালার নিচে গরু পালনের মাধ্যমেও তিনি সংসারে বাড়তি স্বচ্ছলতা এনেছেন। স্বপ্না জানান, সংসারের প্রয়োজনে এবং নিজের হাতখরচের তাগিদে প্রায় ২০ বছর আগে তিনি এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন। ডাক দিতেই একটি মুরগি এল ছানাদের সঙ্গে নিয়ে। দূর থেকে ডানা মেলে উড়াল দিল একটি মোরগ। বুধবার দুপুরে গিয়ে বাড়ি খুঁজতে বেগ পেতে হয়নি। প্রায় ২০ বছর আগে এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পরই স্বপ্নার বিয়ে হয়। সংসারে এসে স্বপ্না রানী সরকার বুঝলেন, স্বামীর আয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না, হাতখরচ তো দূরের কথা।

বাবার বাড়ি শ্রীমঙ্গলের ভৈরবগঞ্জে থাকা অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরপরই তার বিয়ে হয়। স্বামী অবোধ সরকার পেশায় কৃষক। নিজেদের ৩০ শতাংশ জমি ছাড়াও অন্যের জমি বর্গা চাষ করে তাদের সংসার চালাতে হয়। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় স্বপ্না যখন বুঝতে পারেন স্বামীর একার উপার্জনে টান পড়ছে, তখন তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রথম ধাপে তিনি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে তিন জোড়া কবুতর কিনে পালন শুরু করেন। তার মতে, কবুতর দ্রুত বাচ্চা দেয় এবং অল্প যত্নে বড় করা যায় বলে তিনি এটি বেছে নিয়েছিলেন। বর্তমানে এক জোড়া কবুতরের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাসে অনায়াসেই দুই-তিন জোড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়। উঠানের নানা কোণে ছড়িয়ে থাকা কবুতরও সাড়া দিয়ে জড়ো হলো বারান্দায়। বিয়ের তিন-চার মাসের মধ্যেই তিন জোড়া ‘পারো’ (কবুতর) কিনে শুরু করলেন লালন-পালন।

কবুতরের সফলতার পর সময়ের সাথে সাথে তার খামারে যুক্ত হয় হাঁস, মোরগ ও গরু। যদিও নানা সময়ে রোগবালাইয়ের কারণে ছাগল বিক্রি করে ফেলতে হয়েছে, তবে নতুন করে আবারও তা শুরুর পরিকল্পনা তার রয়েছে। বাড়িতে লালনপালন করা মোরগ-মুরগি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি ডিম ও মাংস বিক্রি করেও তিনি আয় করেন। কয়েক বছর আগে ৯ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে একটি গাভি কিনেছিলেন, পরে আরও একটি গাভি যোগ করেন। বর্তমানে তার দুটি গাভির চারটি বাছুর বড় হচ্ছে। গরুগুলোর ঘাস-খড় জোগাড়ের ক্ষেত্রে স্বামী সহযোগিতা করলেও বাকি সব দেখাশোনা করেন স্বপ্না নিজেই।

খামারের গোবর থেকে জ্বালানির ঘুঁটে বা ‘গুমুইট’ তৈরির কাজটিও করেন স্বপ্না, যা রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাকি গোবর তিনি কৃষিজমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করেন। সংসারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এই খামার থেকে বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। নিজস্ব জমিতে মৌসুমি শাকসবজিও ফলান তিনি, যা নিজের ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিতরণ করেন।

স্বপ্না দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, নারীরা ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করলে সংসার স্বাচ্ছন্দ্যে চালানো সম্ভব। তার এই অদম্য চেষ্টাকে সাধুবাদ জানান প্রতিবেশী শম্পা বিশ্বাস। তিনি বলেন, স্বপ্না নিজের সংসার নিজেই দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছেন। স্থানীয় সংগঠক বিউটি রানী সরকার জানান, স্বপ্নার এই পথচলা এলাকার অন্য নারীদের জন্য বড় দৃষ্টান্ত। বিয়ের পর হাতখরচের ছোট চাহিদা থেকে শুরু করে আজ পুরো সংসারের দায়িত্ব নেওয়া স্বপ্না অনেকের কাছেই সফলতার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। ছোট ছোট উদ্যোগে গড়া নিজের সংসারটি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন তিনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

তিন জোড়া কবুতর থেকে স্বাবলম্বী মৌলভীবাজারের স্বপ্না রানী

আপলোডের সময় : 09:11:46 am, Friday, 9 October 2026

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামের গৃহবধূ স্বপ্না রানী সরকার (৪০) আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম। টিনশেডের আধাপাকা ঘরের আঙিনায় তার গড়ে তোলা ছোট্ট খামারে একঝাঁক মোরগ-মুরগি আর কবুতরের কলকাকলি মুখর থাকে সারাদিন। পাশাপাশি পুকুরপাড়ে একচালার নিচে গরু পালনের মাধ্যমেও তিনি সংসারে বাড়তি স্বচ্ছলতা এনেছেন। স্বপ্না জানান, সংসারের প্রয়োজনে এবং নিজের হাতখরচের তাগিদে প্রায় ২০ বছর আগে তিনি এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন। ডাক দিতেই একটি মুরগি এল ছানাদের সঙ্গে নিয়ে। দূর থেকে ডানা মেলে উড়াল দিল একটি মোরগ। বুধবার দুপুরে গিয়ে বাড়ি খুঁজতে বেগ পেতে হয়নি। প্রায় ২০ বছর আগে এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পরই স্বপ্নার বিয়ে হয়। সংসারে এসে স্বপ্না রানী সরকার বুঝলেন, স্বামীর আয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না, হাতখরচ তো দূরের কথা।

বাবার বাড়ি শ্রীমঙ্গলের ভৈরবগঞ্জে থাকা অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরপরই তার বিয়ে হয়। স্বামী অবোধ সরকার পেশায় কৃষক। নিজেদের ৩০ শতাংশ জমি ছাড়াও অন্যের জমি বর্গা চাষ করে তাদের সংসার চালাতে হয়। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় স্বপ্না যখন বুঝতে পারেন স্বামীর একার উপার্জনে টান পড়ছে, তখন তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রথম ধাপে তিনি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে তিন জোড়া কবুতর কিনে পালন শুরু করেন। তার মতে, কবুতর দ্রুত বাচ্চা দেয় এবং অল্প যত্নে বড় করা যায় বলে তিনি এটি বেছে নিয়েছিলেন। বর্তমানে এক জোড়া কবুতরের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাসে অনায়াসেই দুই-তিন জোড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়। উঠানের নানা কোণে ছড়িয়ে থাকা কবুতরও সাড়া দিয়ে জড়ো হলো বারান্দায়। বিয়ের তিন-চার মাসের মধ্যেই তিন জোড়া ‘পারো’ (কবুতর) কিনে শুরু করলেন লালন-পালন।

কবুতরের সফলতার পর সময়ের সাথে সাথে তার খামারে যুক্ত হয় হাঁস, মোরগ ও গরু। যদিও নানা সময়ে রোগবালাইয়ের কারণে ছাগল বিক্রি করে ফেলতে হয়েছে, তবে নতুন করে আবারও তা শুরুর পরিকল্পনা তার রয়েছে। বাড়িতে লালনপালন করা মোরগ-মুরগি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি ডিম ও মাংস বিক্রি করেও তিনি আয় করেন। কয়েক বছর আগে ৯ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে একটি গাভি কিনেছিলেন, পরে আরও একটি গাভি যোগ করেন। বর্তমানে তার দুটি গাভির চারটি বাছুর বড় হচ্ছে। গরুগুলোর ঘাস-খড় জোগাড়ের ক্ষেত্রে স্বামী সহযোগিতা করলেও বাকি সব দেখাশোনা করেন স্বপ্না নিজেই।

খামারের গোবর থেকে জ্বালানির ঘুঁটে বা ‘গুমুইট’ তৈরির কাজটিও করেন স্বপ্না, যা রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাকি গোবর তিনি কৃষিজমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করেন। সংসারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এই খামার থেকে বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। নিজস্ব জমিতে মৌসুমি শাকসবজিও ফলান তিনি, যা নিজের ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিতরণ করেন।

স্বপ্না দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, নারীরা ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করলে সংসার স্বাচ্ছন্দ্যে চালানো সম্ভব। তার এই অদম্য চেষ্টাকে সাধুবাদ জানান প্রতিবেশী শম্পা বিশ্বাস। তিনি বলেন, স্বপ্না নিজের সংসার নিজেই দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছেন। স্থানীয় সংগঠক বিউটি রানী সরকার জানান, স্বপ্নার এই পথচলা এলাকার অন্য নারীদের জন্য বড় দৃষ্টান্ত। বিয়ের পর হাতখরচের ছোট চাহিদা থেকে শুরু করে আজ পুরো সংসারের দায়িত্ব নেওয়া স্বপ্না অনেকের কাছেই সফলতার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। ছোট ছোট উদ্যোগে গড়া নিজের সংসারটি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন তিনি।