৭২ বছরে চিরসবুজ রেখা: রহস্য ও সংগ্রামের গল্প

বলিউডের রূপালী পর্দার চিরসবুজ অভিনেত্রী রেখা আজ ৭২ বছর পূর্ণ করলেন। গত ১০ অক্টোবর তাঁর জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ভক্ত ও অনুরাগী থেকে শুরু করে সব মহলে শুভেচ্ছার জোয়ার বয়ে যায়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি যে রহস্যময়ী ও সাহসী ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, তা আজও বিনোদন জগতে এক আলোচিত বিষয়। অনেকেই তাঁকে ‘এজলেস বিউটি’ হিসেবে অভিহিত করেন। রহস্য, রটনা, চিরসবুজ, অমিতাভ বচ্চন। এই শব্দগুলো চলেই আসে রেখা নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে বলিউডে নানা রটনা চলছে যুগের পর যুগ। রেখা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ‘ভাইরাল’। অমিতাভের সঙ্গে তাঁর নামটি যেন মুদ্রার অন্য পিঠ।

১৯৫৪ সালে তামিল তারকা জেমিনি গণেশন ও তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাভ্যালির ঘরে জন্ম হয় ভানু রেখা গণেশনের। শৈশব থেকেই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, কারণ তাঁর বাবা জেমিনি তাঁকে সন্তানের স্বীকৃতি দেননি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গণ্ডি ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই তিনি কৈশোরে পা রাখেন। পরিবারের ছয় সদস্যের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে কিশোরী রেখা রুপালি পর্দায় ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেন। তাঁর নামের সঙ্গে অনেকে এমন বিশেষণও দেন। গতানুগতিক সমীকরণ থেকে বেরিয়ে নিজের ছন্দেই বেশি সাবলীল।

শুরুর দিকে গায়ের রং এবং হিন্দি ভাষার দক্ষতার অভাবে তাঁকে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ‘রাঙ্গুলা রত্নম’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করলেও, মূল ধারার নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁকে লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাওয়ান ভাদো’ ছবি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এর আগে ‘আনজানা সফর’ ছবির শুটিংয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক দিন মানসিকভাবে পীড়া দিয়েছিল। ইয়াসির ওসমানের লেখা ‘রেখা দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ বই অনুযায়ী, শুটিং সেটে চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে সহশিল্পী বিশ্বজিতের আচরণ ও পরিচালকের নীরবতা তাঁকে অসহায় করে তুলেছিল।

রেখার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বলিউডে রটনার শেষ নেই। ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি ঋষি কাপুর ও নিতু কাপুরের বিয়ের অনুষ্ঠানে সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র পরে হাজির হয়ে তিনি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। যদিও রেখা পরে জানিয়েছিলেন, একটি ছবির শুটিং থেকে সরাসরি আসায় তিনি তা খোলার সময় পাননি। একই বছর তিনি শিল্পপতি মুকেশ আগরওয়ালকে বিয়ে করেন, তবে বিয়ের মাত্র এক বছর পর মুকেশের আত্মহননের ঘটনা তাঁর জীবনে এক করুণ অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।

বিয়ে ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রেখার নাম জড়িয়েছে বহুবার। বিনোদ মেহরার সঙ্গে বিয়ের গুঞ্জনের সময় তাঁর মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উঠে এসেছে। সে সময় বিনোদের মা রেখাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে তাঁকে হেনস্তা করেছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়া অমিতাভ বচ্চনের সাথে তাঁর রসায়ন নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা গুঞ্জন আজও ভক্তদের মাঝে আলোচনার খোরাক জোগায়। এ দুটি নাম মনে এলে একটি দৃশ্য চোখে ভাসে অনেকের, দিগন্তবিস্তৃত বর্ণিল টিউলিপ ফুলের সমারোহে একাকার তাঁরা।

এত সব বিতর্ক ও ব্যক্তিগত লড়াই সত্ত্বেও রেখা বরাবরই নিজের ছন্দ বজায় রেখেছেন। ‘উমরাও জান’, ‘সিলসিলা’, ‘মিস্টার নটবরলাল’ বা ‘উৎসব’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী চরিত্রে তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। পদ্মশ্রী, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার বিজয়ী এই অভিনেত্রী আজ বড় পর্দায় নিয়মিত না হলেও, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকদের মাঝে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

৭২ বছরে চিরসবুজ রেখা: রহস্য ও সংগ্রামের গল্প

আপলোডের সময় : 11:17:10 am, Saturday, 10 October 2026

বলিউডের রূপালী পর্দার চিরসবুজ অভিনেত্রী রেখা আজ ৭২ বছর পূর্ণ করলেন। গত ১০ অক্টোবর তাঁর জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ভক্ত ও অনুরাগী থেকে শুরু করে সব মহলে শুভেচ্ছার জোয়ার বয়ে যায়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি যে রহস্যময়ী ও সাহসী ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, তা আজও বিনোদন জগতে এক আলোচিত বিষয়। অনেকেই তাঁকে ‘এজলেস বিউটি’ হিসেবে অভিহিত করেন। রহস্য, রটনা, চিরসবুজ, অমিতাভ বচ্চন। এই শব্দগুলো চলেই আসে রেখা নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে বলিউডে নানা রটনা চলছে যুগের পর যুগ। রেখা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ‘ভাইরাল’। অমিতাভের সঙ্গে তাঁর নামটি যেন মুদ্রার অন্য পিঠ।

১৯৫৪ সালে তামিল তারকা জেমিনি গণেশন ও তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাভ্যালির ঘরে জন্ম হয় ভানু রেখা গণেশনের। শৈশব থেকেই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, কারণ তাঁর বাবা জেমিনি তাঁকে সন্তানের স্বীকৃতি দেননি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গণ্ডি ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই তিনি কৈশোরে পা রাখেন। পরিবারের ছয় সদস্যের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে কিশোরী রেখা রুপালি পর্দায় ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেন। তাঁর নামের সঙ্গে অনেকে এমন বিশেষণও দেন। গতানুগতিক সমীকরণ থেকে বেরিয়ে নিজের ছন্দেই বেশি সাবলীল।

শুরুর দিকে গায়ের রং এবং হিন্দি ভাষার দক্ষতার অভাবে তাঁকে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ‘রাঙ্গুলা রত্নম’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করলেও, মূল ধারার নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁকে লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাওয়ান ভাদো’ ছবি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এর আগে ‘আনজানা সফর’ ছবির শুটিংয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক দিন মানসিকভাবে পীড়া দিয়েছিল। ইয়াসির ওসমানের লেখা ‘রেখা দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ বই অনুযায়ী, শুটিং সেটে চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে সহশিল্পী বিশ্বজিতের আচরণ ও পরিচালকের নীরবতা তাঁকে অসহায় করে তুলেছিল।

রেখার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বলিউডে রটনার শেষ নেই। ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি ঋষি কাপুর ও নিতু কাপুরের বিয়ের অনুষ্ঠানে সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র পরে হাজির হয়ে তিনি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। যদিও রেখা পরে জানিয়েছিলেন, একটি ছবির শুটিং থেকে সরাসরি আসায় তিনি তা খোলার সময় পাননি। একই বছর তিনি শিল্পপতি মুকেশ আগরওয়ালকে বিয়ে করেন, তবে বিয়ের মাত্র এক বছর পর মুকেশের আত্মহননের ঘটনা তাঁর জীবনে এক করুণ অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।

বিয়ে ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রেখার নাম জড়িয়েছে বহুবার। বিনোদ মেহরার সঙ্গে বিয়ের গুঞ্জনের সময় তাঁর মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উঠে এসেছে। সে সময় বিনোদের মা রেখাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে তাঁকে হেনস্তা করেছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়া অমিতাভ বচ্চনের সাথে তাঁর রসায়ন নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা গুঞ্জন আজও ভক্তদের মাঝে আলোচনার খোরাক জোগায়। এ দুটি নাম মনে এলে একটি দৃশ্য চোখে ভাসে অনেকের, দিগন্তবিস্তৃত বর্ণিল টিউলিপ ফুলের সমারোহে একাকার তাঁরা।

এত সব বিতর্ক ও ব্যক্তিগত লড়াই সত্ত্বেও রেখা বরাবরই নিজের ছন্দ বজায় রেখেছেন। ‘উমরাও জান’, ‘সিলসিলা’, ‘মিস্টার নটবরলাল’ বা ‘উৎসব’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী চরিত্রে তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। পদ্মশ্রী, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার বিজয়ী এই অভিনেত্রী আজ বড় পর্দায় নিয়মিত না হলেও, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকদের মাঝে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।