
বগুড়ায় একুশ ল্যাংগুয়েজ এন্ড আইটি ইন্সটিটিউট (কোরিয়ান ও জাপান ভাষা সেন্টার) নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে ২ ভাইয়ের একটি সিন্ডিকেট। শিক্ষার্থীদের কোরিয়া ও জাপানে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠানোর প্রলোভন দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
বগুড়া শহরের সেউজগাড়ীর কারমাইকেল সড়কে এই প্রতিষ্ঠান খুলে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিল তারা। পরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি অফিসে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। তবে প্রতারক চক্রের সদস্য আবু জাফর ও তার স্ত্রী সানজিদা পায়েলকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু প্রতারক চক্রের মুল হোতা জাহিরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা এখনও রয়েছে অধরা। এ ব্যাপারে প্রতারিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে থানায় মামলা হয়েছে।
প্রতারণার শিকার শহরের পুরান বগুড়ার মো: সদরুল হোসেনের ছেলে মো: মনজরুল হাসান সজীব (২৩) বলেন, পটুয়াখালির মধ্য কুড়ালিয়ার হরতকি বাড়িয়া এলাকার জাহাঙ্গীর প্যাদা ছেলে মো: জহিরুল ইসলাম (৩৫) তার ছোট মো: আবু জাফর (৩০), তাদের বাবা মো: জাহাঙ্গীর প্যাদা ও আবু জাফরের স্ত্রী সানজিদা পায়েল (২৫) প্রতারক সিন্ডিকেটের সদস্য।
বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী এলাকায় কারমাইকেল সড়কে শামিম হাসানের মুন ম্যানসন নামে বাড়ির ২য় তলা ভাড়া নিয়ে ‘একুশ ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড আইটি ইন্সটিটিউট (কোরিয়ান ও জাপান ভাষা সেন্টার)’ খুলে বসে এই চক্র। কোরিয়া-জাপানে উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে চটকদারী বিজ্ঞাপন এর মাধ্যমে আকৃষ্ট করে শিক্ষার্থীদের। এরপর চক্রটি মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের কাছ হতে বিভিন্ন সময়ে কৌশলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়।
ফরিদপুর মেরিন ইনস্টিটিউট থেকে মেরিন ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা সজীব আরও বলেন, গত বছরের ১০ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেউজগাড়ীতে তাদের ওই প্রতিষ্ঠানে তাকে জাপানে পাঠানোর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তার কাছ হতে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করে এবং ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি চেক এবং নন জুডিশিয়াল ৩টি স্ট্যাম্পে ২নং আসামি আবু জাফর প্রাপ্তি স্বীকারান্তে স্বাক্ষর করে দেয় চক্রটি।
কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ওই আসামিরা তাকে এবং তার সহপাঠিদের বিদেশ পাঠাতে না পারলে তিনি ও তার সহপাঠিরা টাকা ফেরত চান। কিন্তু তারা বিভিন্ন তালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এরপর গত বছরের ১৫ নভেম্বর তিনি ও তার সহপাঠিরা সেউজগাড়ীতে তাদের ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের পাওনা টাকা ফেরত চাইলে তারা টাকা দিবে না বলে জানায় এবং বিভিন্ন ধরণের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে।
এক পর্যায়ে ওই চক্র সেউজগাড়ীস্থ তাদের অফিস বন্ধ করে ঢাকায় প্রধান অফিসে কৌশলে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি ওই চক্রের হোতা জহিরুল ইসলাম ও তার ভাই আবু জাফরসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে আবু জাফর ও তার স্ত্রী সানজিদা পায়েলকে গ্রেফতার করেছে।
অপর দিকে, প্রতারণার শিকার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের পালিহার গ্রামের শিক্ষার্থী আশা বানু, তার বোন রুমা বানু, সহপাঠি শওকত আলী, আরিফুল ইসলাম, শোকের আলী, রুহুল আমিন, মনজু আমান, কামরুল ও সজিব অভিযোগ করে বলেন, জহিরুল ইসলাম (৩৫) ও তার ভাই আবু জাফর (৩০) এর নেতৃত্বে একই প্রতারক চক্র উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান খুলে পরস্পর যোগসাজসে প্রায় ১০ মাস আগে তাদের কাছ থেকে কোরিয়া ও জাপান এ পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ হতে পর্যাযক্রমে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এই টাকা ফেরত চাইলে তারা বিভিন্ন তালবাহানা করে এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়। এরপর প্রধান আসামি জাহিরুলের ঢাকায় প্রধান শাখা ফার্মগেট অফিসে যোগাযোগ করলে টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করে। এই শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, এ পর্যন্ত এই চক্র বগুড়ায় অর্ধশত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারা ভিসা ও পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দেয়ার কথা বলেও টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এমনকি তারা তাদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলে গেছে। সারাদেশে তাদের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতারণার জাল বিছিয়ে তারা প্রতারণা করে আসছে।
সেউজগাড়ী কারমাইকেল সড়কের মুন ম্যানসনের মালিক শামিম হাসান জানান, মাত্র ৩ মাস আগে তারা তার বাড়ি ভাড়া নিয়ে একুশ ল্যাংগুয়েজ এন্ড আইটি ইন্সটিটিউট (কোরিয়ান ও জাপান ভাষা সেন্টার) খুলে বসে। শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তারা যে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল তা তিনি জানতেন না। তারা ৩০ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বাকি রেখে চলে গেছে।
এ দিকে আমাদের অনলাইন প্রতিবেদক নিউজটি করতে গেলে সাংবাদিক পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে মোবাইলে ফোন দেয়। এ সময় অনলাইন প্রতিবেদককে সর্তক করে দিয়ে বলা হয় অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম জহির একজন অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি। তার বিষয়ে যেন প্রতিবেদনটি ভেবে প্রকাশ করা হয়।
এ ব্যাপারে তদন্তকারি কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার এসআই মো: তরিকুল ইসলাম বলেন. কোরিয়া ও জাপানে উচ্চ শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ঘটনায় আবু জাফর ও তার স্ত্রী সানজিদাকে শহরের সুত্রাপুর কসাইপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ভিসা ও পাসপোর্ট করে দেয়ার নাম করেও টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পলাতক অন্যান্য আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।