
বগুড়ার কাহালুতে সরকারী জালমহাল গোপনে প্রতারণার মাধ্যমে ইজারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৯জুলাই এ।
ঘটনার সূত্র, স্থানীয় ইজারাদারবৃন্দ ও প্রত্যক্ষদর্শিদের তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায় প্রতিবছর সরকারী জালমহাল ইজারা প্রদান করা হয় ২টি পদ্ধতিতে। ১. সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধিত মৎস্যজীবি সমবায় সমিতিদের জন্য ৩বছরের জালমহাল বরাদ্দ আর ২. অন্যটি হলো ১ বছরের জন্য খাস কালেকশানের মাধ্যমে। ২টি পদ্ধতিতেই সরকারী জালমহাল ইজারা প্রদানের আগে এলাকায় ব্যপক প্রচার-প্রচারণার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ও এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাইক বাজিয়ে ইজারা ইচ্ছুক মৎসজীবি ব্যবসায়ী,এলাকার ব্যক্তিবর্গ ও মৎসজীবি সমিতিদের অবগত করা হয়। মৎসজীবি সমিতিদের মাধ্যমে ইজারাকৃত জালমহাল ৩বছরের জন্য এবং খাস কালেকশানের পুকুরগুলো ১ বছরের জন্য সরকারী ভাবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ইজারা ডাকের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা হয়। এতে সরকারী রাজস্ব বৃদ্ধি পায় যা এলাকার ও সরকারী উন্নয়নমূলক ও সমাজ সেবামূলক কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
কিন্তু বিগত দিনে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে কাহালুতে যেন লুটপাট, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হত্যার হুমকি, মাদক ব্যবসার অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে।
যেভাবে ইজারা নেওয়া হয় ৮ একরের পুকুরটি: সরকারী জালমহাল ইজারা প্রদানের আগে সরকারীভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও মাইকের মাধ্যমে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রচারণার ব্যবস্থা থাকলেও গত ২৪ জুলাই হঠাৎ করেই কাহালু উপজেলার সহকারী কমিশনার(ভূমি) একটি অফিসিয়ালি চিঠি ইস্যু করে এবং গত ২৯শে জুলাই কাহালু উপজেলার নির্বাহি অফিসারের সভাকক্ষে ডাকের মাধ্যমে সরকারী জালমহাল ১বছরের খাস কালেকশানের জন্য ইজারা প্রদানের লক্ষ্যে ইজারা ডাকা হয় যা অনেক মৎস্যজীবি ব্যবসায়ী মহলই অবগত নয় বলে জানা গেছে। এছাড়াও উক্ত ইজারার দিনে সকল পুকুর ডাকের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা হলেও কাহালু উপজেলার নারহট্ট মৌজার ১৩৫২/১৮৯৫ দাগের ৮ একর সরকারী খাসের পুকুরটি ডাক প্রদান করেনি উপজেলা প্রশাসন। বিষয়টি উপস্থিত মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানতে চাইলে উপজেলার নির্বাহি কর্মকর্তা জানান উক্ত পুকুরটি আগেই ইজারা প্রদান করা হয়েছে।কত টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি তাদের জানান, ১ বছরের সরকারী ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৭ হাজার ৬৮৬ টাকা আর যিনি ইজারা নিয়েছেন তিনি ২ লক্ষ ৪০হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছেন।কে নিয়েছেন প্রশ্নে উত্তরে ইউএনও জানান, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মোমিন সাহেব নিয়েছেন।
ইজারা নেওয়ার প্রতারণা ঢাকতে নেওয়া হয় যে কৌশল: গত ২৩ জুলাই কাহালু উপজেলার নির্বাহি অফিসার মো: কাওছার হাবিবের সঙ্গে স্থানীয় বেশ কয়েকজন বিএনপির নেতাদের নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: আব্দুল মোমিন একটি গোপনীয় বৈঠক করেন। সেখানে উক্ত নারহট্ট মৌজার ১৩৫২/১৮৯৫ দাগের ৮ একর সরকারী খাসের পুকুরটি আব্দুল মোমিন ইজারা নিতে ইউএনওকে চাপ প্রয়োগ করেন। এতে ইউএনও সরকারী নীতিমালার বাধ্য বাধকতার বিষয়টি তুলে ধরলে তখন আব্দুল মোমিন তার নিজের আত্নীয় ও নারহট্ট ইউনিয়নেরই একজন ট্রাকের ড্রাইভার যার নাম মো: আব্দুল কুদ্দুস ও একই গ্রামের ও তারই ঘনিষ্ট মিলন প্রামানিক ও তার আপন ভাতিজা মো: জাকির হোসেনের নাম দিয়ে ডাকে অংশগ্রহণের তালিকা প্রস্তুত করতে বলেন এবং মো: জাকির হোসেনের নামে পুকুরটি ইজারা দিতে বলেন। পরবর্তীতে ইউএনও এসিল্যান্ডকে বিষয়টি বললে, এসিল্যান্ড গত ২৪শে জুলাই অফিসালিভাবে শুধুমাত্র একটি নোটিশ আকারে চিঠি ইস্যু করে দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখেন।
ডাকে অংশগ্রহণকারী ও স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের এই বিষয়ে যে অভিযোগ: এই বিষয়ে ডাক গ্রহণে একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, এই পুকুরটি দীর্ঘ দিন ধরে বগুড়ার যুবলীগের নেতা, শাহ ফতেহ আলীর মালিক ও বগুড়া পৌরসভার ১৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো: আমিনুল ইসলাম এর দখলে ছিল।গত বছরের ৪ আগস্ট বগুড়ায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কমরউদ্দিন বাঙ্গি হত্যা মামলায় গত ১৯ জুলাই ২০২৫ ইং তারিখ রোজ শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় গুলশান থানাধীন এলাকা হতে বগুড়া জেলা ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।মূলত আমিনুল পুকুরটি দখলে রাখতে তারই নির্দেশে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: আব্দুল মোমিন প্রতারণার মাধ্যমে তার দখলে নিয়েছে পুকুরটি।৮একরের এই পুকুরটি যদি সরকারীভাবে খোলা ডাকের মাধ্যমে ইজারা দেয় তবে প্রতি বৎসর ৪ লাখের উপরে সরকারীভাবে রাজস্ব আদায় করতে পারবে উপজেলা প্রশাসন।৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোমিন এই উপজেলার বিভিন্ন আওয়ামীলীগ নেতাদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শেন্টার দিয়ে যাচ্ছে ।নারহট্ট ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি পান্না ও সাধারণ সম্পাদক তোতা শাহানাকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শেল্টার দিয়ে এলাকায় অবাধে চলাফেরার সুযোগ করে দিয়েছে এ্ই মোমিন।
তারা আরো অভিযোগ করেন, শুধু নারহট্ট ইউনিয়নেই নয়, কাহালু উপজেলার আওয়ামলিীগের সব নেতাদেরকেই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সে শেল্টার দিয়ে রেখেছে। সব জায়গায় সে তার লোকজনকে দিয়ে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাকে কেউ কিছু বললে সে সাবেক এমপির ডান হাত পরিচয়ে বিভিন্ন ভয়-ভীতি দেখায় এমনকি পুলিশ দিয়ে আওয়ামীলীগ সাজিয়ে গ্রেফতারেরও ভয়-ভীতি দেখায় সে।
আমরা এই গোপনে ইজারা ডাক মানিনা।এই ডাক বাতিল করে নতুন করে ইজারার তারিখ ঘোষণা করতে হবে এবং এলাকায় প্রচারের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও মাইকিং করতে হবে বলেও ডাকে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা মতামত ব্যক্ত করেন।
এই বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: আব্দুল মোমিন এর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানিনা আর আমি বা আমার কোন লোক সরকারী খাসের পুকুরটি ইজারা নেয়নি। যিনি নিয়েছেন আপনি তার সাথে কথা বলেন।
ডাকে অংশগ্রহণকারীর তালিকা অনুযায়ী, মো: আব্দুল কুদ্দুসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মোমিনের আপন ভাতিজা পুকুরটি নিয়েছে। আর আমি বিএনপির মোমিনের আপন ভাই হই।কবে পুকুরটি ডাক হয়েছে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,গত মাসে ডাক হয়েছে।কোথায় ডাক হয়েছে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, উপজেলায় হয়েছে। আপনি কি করেন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি বিবিরপুকুরে মাছের হ্যাচারির মালিক শফিকুলের গাড়ি চালাই। আপনি মোমিনের সাথে কথা বলেন।তিনিই সবকিছু জানেন।
পুকুরটি ইজারা নেওয়া জাকির হোসেনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে, তিনি বলেন আমি পুকুরটি ১বছরের জন্য ২ লাখ ৪০হাজার দিয়ে নিয়েছি।ডাকে কতজন অংশ নিয়েছিল প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ৩জন। তারা কোথাকার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তারা সকলেই নারহট্ট গ্রামের।ডাকে অংশগ্রহনের বিষয়টি কিভাবে জানেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, গত কয়েকদিন আগে নোটিশ দিয়েছে সেখান থেকে জেনেছি। নোটিশের বিষয়টি কেউ জানলো না আপনার কিভাবে জানলেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তা আমি জানিনা।
এই বিষয়ে কাহালু উপজেলার নির্বাহি অফিসার মো: কাওসার হাবিবের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি কোন অন্যায় করিনি। যা করেছি তা বিধি মোতাবেক করেছি।সরকারী ডাকের অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে তিনি নিয়েছেন। এই বিষয়ে কারো যদি কোন অভিযোগ থাকে তবে আমার কাছে জানাতে বলবেন। আমি তাদের অভিযোগ শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।