কক্সবাজারে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: নিখোঁজ চার সদস্যের সন্ধানে স্বজনরা

সাত ও তিন বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে স্ত্রীসহ অবকাশ যাপনের জন্য কক্সবাজারে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন নাহিদুর রহমান তুহিন। সমুদ্রসৈকতে আনন্দের সময় কাটাতে গিয়ে তারা উঠেছিলেন উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে। স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, নাহিদুর গত ১১ অক্টোবর ওই রিসোর্টে বুকিং সম্পন্ন করেছিলেন। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে তাদের একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টার দিকে তাদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়ের আগেই শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে রিসোর্টটিতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছোটবেলায় নাহিদুরকে তার কাছে রেখেই অফিসে যেতেন মা। জানিয়েছিল, তারা সমুদ্রসৈকতে আছে, শিশুরা খেলছে। সবাইকে নিয়ে সৈকতে আনন্দ করছিল তারা।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নাহিদুর, তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের কোনো সন্ধান মিলছে না। হাসপাতালে ভর্তি থাকা আহত ব্যক্তিদের তালিকায় কিংবা অন্য কোথাও তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও কার মরদেহ কোনটি, তা এখনো পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখানে থাকা চারটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের মধ্যে দুটিই শিশুর। পরিবারের সদস্যরা এখন দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন যে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাদের আপনজনরা রয়েছেন কি না। নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি। পরিচয় শনাক্তের জন্য তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সে সময় থেকে নাহিদুরের দুধমা হিসেবে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিয়মিত ছেলের ঢাকার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা নিতেন তিনি। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবে এবং বুধবার তাকে মিরপুরের বাসায় যেতে বলেছিল নাহিদুর। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাকি চারজনের মধ্যে দুই নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ রয়েছেন।

নিখোঁজ নাহিদুরের পরিবারের সদস্যদের আহাজারি থামছে না। তার ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন; তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার আদরের স্বজনরা আর নেই। নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে নাহিদুর গ্রামে গিয়েছিল এবং তখন তাকে দুশ্চিন্তা না করতে বলে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু সেই শেষ দেখার স্মৃতি এখন পরিবারের জন্য অসহ্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। মরদেহগুলোর চেহারা চেনার মতো অবস্থায় নেই। তারা গ্রামে এলে পুরো বাড়ি আনন্দে মাতিয়ে রাখত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি পরিবারের সদস্যদের বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

এ বিষয়ে যশোরের মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অন্যদিকে, উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় অবহেলা ও নিরাপত্তার অভাবের অভিযোগে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করে মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, উদ্ধারকৃত ১০টি মরদেহের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে এবং বাকিদের শনাক্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রশাসন দ্রুত পুরো ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। একই পরিবারের চার সদস্যের নিখোঁজের ঘটনায় যশোরের মনিরামপুর পৌর শহরের মোহনপুর কারিকরপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

জনপ্রিয় সংবাদ

​বগুড়ার নন্দীগ্রামে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় গৃহবধূসহ নিহত ২

Verified by MonsterInsights

কক্সবাজারে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: নিখোঁজ চার সদস্যের সন্ধানে স্বজনরা

আপলোডের সময় : 11:25:38 am, Monday, 19 October 2026

সাত ও তিন বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে স্ত্রীসহ অবকাশ যাপনের জন্য কক্সবাজারে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন নাহিদুর রহমান তুহিন। সমুদ্রসৈকতে আনন্দের সময় কাটাতে গিয়ে তারা উঠেছিলেন উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে। স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, নাহিদুর গত ১১ অক্টোবর ওই রিসোর্টে বুকিং সম্পন্ন করেছিলেন। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে তাদের একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টার দিকে তাদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়ের আগেই শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে রিসোর্টটিতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছোটবেলায় নাহিদুরকে তার কাছে রেখেই অফিসে যেতেন মা। জানিয়েছিল, তারা সমুদ্রসৈকতে আছে, শিশুরা খেলছে। সবাইকে নিয়ে সৈকতে আনন্দ করছিল তারা।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নাহিদুর, তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের কোনো সন্ধান মিলছে না। হাসপাতালে ভর্তি থাকা আহত ব্যক্তিদের তালিকায় কিংবা অন্য কোথাও তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও কার মরদেহ কোনটি, তা এখনো পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখানে থাকা চারটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের মধ্যে দুটিই শিশুর। পরিবারের সদস্যরা এখন দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন যে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাদের আপনজনরা রয়েছেন কি না। নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি। পরিচয় শনাক্তের জন্য তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সে সময় থেকে নাহিদুরের দুধমা হিসেবে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিয়মিত ছেলের ঢাকার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা নিতেন তিনি। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবে এবং বুধবার তাকে মিরপুরের বাসায় যেতে বলেছিল নাহিদুর। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাকি চারজনের মধ্যে দুই নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ রয়েছেন।

নিখোঁজ নাহিদুরের পরিবারের সদস্যদের আহাজারি থামছে না। তার ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন; তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার আদরের স্বজনরা আর নেই। নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে নাহিদুর গ্রামে গিয়েছিল এবং তখন তাকে দুশ্চিন্তা না করতে বলে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু সেই শেষ দেখার স্মৃতি এখন পরিবারের জন্য অসহ্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। মরদেহগুলোর চেহারা চেনার মতো অবস্থায় নেই। তারা গ্রামে এলে পুরো বাড়ি আনন্দে মাতিয়ে রাখত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি পরিবারের সদস্যদের বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

এ বিষয়ে যশোরের মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অন্যদিকে, উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় অবহেলা ও নিরাপত্তার অভাবের অভিযোগে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করে মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, উদ্ধারকৃত ১০টি মরদেহের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে এবং বাকিদের শনাক্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রশাসন দ্রুত পুরো ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। একই পরিবারের চার সদস্যের নিখোঁজের ঘটনায় যশোরের মনিরামপুর পৌর শহরের মোহনপুর কারিকরপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।