
‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’—এই প্রবাদটি কি নিছক একটি গল্প, নাকি ক্ষমতার চরিত্র বোঝার এক নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা? যারা একসময় পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাই যখন ক্ষমতায় গিয়ে একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়েন, তখন প্রশ্ন জাগে, আসলে কি ব্যবস্থা বদল হয়েছে, নাকি শুধু রাবণের মুখ পরিবর্তন হয়েছে?
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগের মোট অঙ্ক ১১ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের আর্থিক দুর্নীতির দাবিটি যেমন রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে হওয়া উচিত, তেমনি কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথম ও শেষ কথা হলো, অভিযোগের বিচার হতে হবে প্রমাণ সাপেক্ষে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
সর্বশেষ তথ্যমতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে। বিদেশে অর্থপাচারের তালিকায় রয়েছে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া পর্তুগালে জমি ক্রয়, দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রাখার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এর সপক্ষে ব্যাংক হিসাব, সম্পদের মালিকানা, কোম্পানির নথি এবং অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড থাকার কথা।
দুদকের জন্য এই অনুসন্ধান এক বড় পরীক্ষা। একইভাবে আসিফ মাহমুদের জন্যও এটি রাজনৈতিক স্বচ্ছতার পরীক্ষা। তিনি যদি এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন, তবে তাঁর সবচেয়ে বলিষ্ঠ জবাব হতে পারে তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সামনে আনা এবং চ্যালেঞ্জ জানানো: “প্রমাণ করুন।” কারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে নথি অনেক বেশি জোরালো। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার 1MDB কেলেঙ্কারি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিচারিক প্রক্রিয়ার উদাহরণটি খুবই প্রাসঙ্গিক, যা ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আসার বার্তা দেয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দুর্নীতির প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেছেন, “I never compromise on the issue of corruption.” বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দলের বা আন্দোলনের পুরোনো মুখ কি না, তা বিচার না করে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। মাহাথির মোহাম্মদের মতে, শীর্ষে দুর্নীতি থাকলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা ঘুষকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ না রেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত করে।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতির অন্যতম মূল পুঁজি ছিল নৈতিকতা ও লুটপাট-দখল বা দলীয়করণের বিরুদ্ধে অবস্থান। এখন সেই প্রজন্মের নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় স্বভাবতই জনমনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মানুষ জানতে চায়, আমরা কি নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছি, নাকি পুরোনো ব্যবস্থারই একটি ভিন্ন সংস্করণ দেখছি? আসিফ মাহমুদ দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, আবার নির্দোষ হলে তদন্ত শেষে দায়মুক্তিও পেতে হবে।
আইনের চোখে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই ঢাল হতে পারে না। বাছাইমূলক বিচার বা ‘নিজের লোক’ ও ‘অন্যের লোক’ বিভাজন দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে ব্যর্থ করে দেয়। দুদককে প্রমাণ করতে হবে যে, এটি কোনো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের অভিযান নয়, আবার কোনো ক্ষমতাবানকে রক্ষার চেষ্টা নয়। প্রমাণ থাকলে মামলা হবে, না থাকলে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি মিলবে এবং মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ করা হবে। এই প্রশ্নের উত্তরগুলোই নির্ধারণ করবে নতুন বাংলাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতার স্বরূপ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে জরুরি একটি বিষয় আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ রাজনৈতিক বক্তৃতা সন্দেহ দূর করে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই জায়গায় মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: 1MDB কেলেঙ্কারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক একসঙ্গে কাজ করলে দুর্নীতি কী ভয়ংকর মাত্রা নিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক আনুগত্য দেখে কাজ করে, তাহলে সেটি আর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান থাকে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাহাথির মোহাম্মদের একটি বহুল উদ্ধৃত মন্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক: “When you have a prime minister who is corrupt, then you can be sure that a country cannot be anything else but corrupt। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কথাটির সারকথা হলো, শীর্ষে দুর্নীতি জায়গা করে নিলে তার প্রভাব নিচে নেমে আসে।
প্রতিনিধির নাম 
























