
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি ও ৭৫ শতাংশ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। দীর্ঘ প্রায় ৬০০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েকশ কোটি মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। ১৪১৫ সালে মরক্কোয় পর্তুগালের উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত অবসান ঘটে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়। পর্তুগাল ১৯৯৯ সালে ম্যাকাও দ্বীপ চীনের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে এর সমাপ্তি টানে।
ঔপনিবেশিক দখলের কালপঞ্জি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিস্তৃত ছিল। ১৪৯৩ সালে হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিক তথা হিসপানিওয়ালা দ্বীপ দখলের মাধ্যমে স্পেনের যে ঔপনিবেশিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ১৮৯৮ সালে কিউবার স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। একইভাবে, ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৯ সালে হংকং হস্তান্তরের মাধ্যমে তাদের শাসনের ইতি ঘটে। অন্যদিকে, ১৬১৯ সালে জাকার্তা দখলের মাধ্যমে ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে নেদারল্যান্ডসের ঔপনিবেশিক শাসন ইন্দোনেশিয়ায় শুরু করেছিল, তার সমাপ্তি ঘটে ১৯৭৫ সালে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ নিয়াল ক্যাম্পবেল ফার্গুসন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যে, মাত্র ৯০০ কর্মকর্তা ও ৭০ হাজার সৈন্য দিয়ে কীভাবে ২৫ কোটির বেশি মানুষের ভারত শাসন সম্ভব হয়েছিল। তার মতে, ব্রিটিশরা সামরিক কৌশলের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থে রেল-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়েছিল। তবে ফার্গুসনের এই দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৪ সালে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার সামরিক সদস্য ছিল এবং যুদ্ধের শেষে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়। মূলত ভারতের দরিদ্র কৃষকদের সন্তানদেরই খুব নিম্ন বেতনে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হতো।
১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার বিতর্কিত ‘অ্যানর্কিকেল অ্যান্ড রেভ্যুলুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট’ পাস করে, যা বিনা বিচারে যেকোনো সন্দেহভাজন ভারতীয়কে আটকের সুযোগ তৈরি করে। এই আইনের প্রতিবাদে পাঞ্জাবে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ই এপ্রিল অমৃতসরের জালিনওয়ালাবাগে একটি দেয়ালঘেরা মাঠে বৈশাখী উৎসব উপলক্ষ্যে ১০ থেকে ১৫ হাজার সাধারণ মানুষ সমবেত হয়েছিল। সেখানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিল্যান্ড ডায়ারের নেতৃত্বে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ১০ মিনিট ধরে অবিরাম গুলিবর্ষণ করা হয়। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এই নারকীয় হামলায় ৩৭৯ জন তাৎক্ষণিকভাবে নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও জনগোষ্ঠীর মন ও মনন থেকে ঔপনিবেশিক চিন্তাপদ্ধতির প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় না। শাসকরা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির কাঠামোকে বিকৃত করে নিজেদের অনুগত করার যে প্রক্রিয়া চালিয়েছে, তার বিরূপ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই বিকৃতির শৃঙ্খল ভেঙে যথার্থ স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হতে হলে সচেতন সংগ্রামের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়লেও, তাদের তৈরি করা কাঠামোগত প্রভাব আজও বহু স্বাধীন রাষ্ট্রে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-২। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়কালে, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ এক একটি ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে, সমষ্টিগতভাবে, পৃথিবীর প্রায় ৮০ ভাগ ভূমি ও প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাছাড়া, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের ভেতর বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে, একদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে উপনিবেশিত দেশসমূহে কোথাও শুধু জাতীয়তাবাদী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাধারণভাবে, এই হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের ৫০০ বছরের উত্থান-পতনের কালপঞ্জি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আমরা যদি ১৪১৫ সালের আগস্ট মাসে পর্তুগাল কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর উপনিবেশায়নকে পৃথিবীতে ইউরোপীয় উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করি, আর সেই পর্তুগাল কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ইতিপূর্বে উপনিবেশিত এশিয়ার ম্যাকাও দ্বীপকে চীনের কাছে। 1415, 1999, 600. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ধরে স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ব্রিটেনসহ নানা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির শাসন-শোষণাধীন থেকেছে।
প্রতিনিধির নাম 
























