
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও এই খাতের ওপর থেকে ভর্তুকির চাপ পুরোপুরি কমছে না। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যার ফলে লোকসানের বোঝা বড় হচ্ছে। ‘এলএনজি ও বিদ্যুতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ’— এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়তির কারণে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে বাংলাদেশের। এতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা কয়েক গুণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ছয় মাসে তাদের ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই সময়কালে সংস্থার মাসিক গড় লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ডিসেম্বর নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরও, ডিজেলের আমদানিতে এখনো প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে, অথচ পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহ সংকটের কারণে উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এর বাইরে গত ছয় মাসে পেট্রোবাংলার নির্ধারিত বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে চলতি বছরের শুরুতে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলারে এলএনজি কেনা হতো, চলতি সেপ্টেম্বরে সেই দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্যাসের তীব্র সংকট মেটাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়াতে হয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় এবং মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় লোকসান বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে বা সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সরকারের আর্থিক চাপ কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ক্ষেত্রে একদিকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা ও অন্যদিকে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের পর দেশে তা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে নিত্যপণ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজি ও মাছের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় মাছবাহী ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রুই, কাতলা, চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের দামে এর প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন স্থল থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবহন খরচ বাড়ায় চূড়ান্ত মূল্যে তার প্রভাব পড়ছে।
অন্যান্য সংবাদের মধ্যে, দেশজুড়ে হাম নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা ও শিশুদের মৃত্যু নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত হামে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতে ভুল ও প্রস্তুতির অভাবকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় নিম্নবিত্ত মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
নিরাপত্তা গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির পেছনে বিদেশে বসে কিছু অশুভ চক্র অর্থায়ন করছে। পুলিশি নজরদারিতে ধরা পড়া আসামিদের জবানবন্দিতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগে অর্থ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 
























