
রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভয়াবহ লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং লুণ্ঠিত মালামালের মধ্যে দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার দুই দিন পার হলেও নেপথ্যে থাকা মূল ইন্ধনদাতা বা নির্দেশদাতাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়াতেই পরিকল্পিতভাবে এই দখলযজ্ঞ চালানো হয়েছে। তবে ঘটনায় মূল ইন্ধনদাতা বা নির্দেশদাতাদের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা বা কারও তথ্য পাওয়ার কথা জানায়নি পুলিশ। বলছেন, এই হামলা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ঘটনার সূত্রপাত হয় রাত ১২টা ১৫ মিনিটে, যখন হাসপাতালের সামনে একটি ট্রাক দাঁড়ায়। এরপরই বিশাল আকৃতির একটি এস্কেভেটর নিয়ে সেখানে দুর্বৃত্তদের একটি দল উপস্থিত হয়। রাত ১টার দিকে এস্কেভেটর দিয়ে ভাঙচুর শুরু করার সময় শত শত মুখোশহীন মানুষ ক্লিনিকে ঢুকে পড়ে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনাস্থলে পুলিশের টহল গাড়ি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে লুটপাট চালিয়ে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, শাহ-আলী পীরের স্মৃতিবিজড়িত এই ভূমির দখল নিতেই বিভিন্ন সময়ের প্রভাবশালীরা লোভাতুর দৃষ্টি ফেলেছিল। বাহার নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুলিশের সামনে এমন তাণ্ডব চললেও তারা কেন নীরব ছিল, সেই উত্তর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিতে হবে। রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলো, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট, দায়ের করা মামলার এজাহার ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি জমি দখল সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই ঘটানো হয়েছে। মতলব নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, এই হাসপাতালের জায়গায় কেউ দখল করার অধিকার নেই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই ঘটনার নেপথ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্লিনিকের দেয়ালে যে ‘সমমনা সমবায় সমিতি’র সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছিল, তার সঙ্গে এমপি মিষ্টির যোগসূত্র থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সাড়া দেননি। অপরদিকে, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানিয়েছেন, এ ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মী ও একজন এমপির নাম শোনা যাচ্ছে; সত্যতা মিললে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ঘটনাটি ঘটেছে।
পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ ঘটনার রাতে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি পুলিশকে এক ঘণ্টা আগেই সতর্ক করেছিলেন। তবে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের স্বাক্ষরিত আদেশে শাহআলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হচ্ছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বলেন, ‘আমরা আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু যারা নির্দেশদাতা, তারা তো সরাসরি ভাঙচুরে অংশ নেয় না; তারা পেছন থেকে ছড়ি ঘোরায়। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হোক।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নেতৃত্বে কর্মীরা ক্লিনিক প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। তারা হামলার সাথে জড়িত সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতা দাবি করে দোষীদের বিচার ও ক্লিনিকটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিনিধির নাম 
























