বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বরাবরই জটিল ও আঁকাবাঁকা। সরল অংকের মতো মনে হলেও রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানো কার্যত দুরূহ। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার পথ কখনোই এমন অনিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল না, যা আজ ৫৫ বছর পর আমাদের দেখতে হচ্ছে। রাজনীতির এই ধারা যখন জনমুখী হওয়ার কথা ছিল, তখন যেন উল্টো পথেই হাঁটছে দেশ। অথচ ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের কল্যাণ ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক উত্তাল ও নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দলটির টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে এই পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের গণতন্ত্রের চিত্র কতটা বদলেছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ে গণতন্ত্রের পরিবর্তে বরং এক নতুন ধরনের ‘মবোক্র্যাসি’ বা জনতা-শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা ৫৫ বছরের ইতিহাসে এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। হাসিনা সরকারের পতনের পর মনে করা হয়েছিল, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালনা করতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হওয়ায় তারা সে পথে হাঁটেনি। মবোক্র্যাসিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ। এর ফলে মবোক্র্যাসি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলে। নির্বাচিত সরকার আসার পর মবোক্র্যাসি অনেকটাই কমে গেছে। তবে গণতন্ত্র এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পালাবদলের পরেও দেশের শাসনব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নানা উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশেষভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেখানে পুলিশের জনবান্ধব ও সেবামূলক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব পালনের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর আজও সাধারণ মানুষকে নিজেদের মত প্রকাশের জন্য পুলিশের গুলির শিকার হতে হচ্ছে—এই বাস্তবতা দেশের জন্য এক গভীর সংকট নির্দেশ করে। রাজনীতির এই অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতাময় পথ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে। যখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়ার কথা জনকল্যাণ, সেখানে রাজনীতির গতিপথ কেন বারবার ভুল দিকে মোড় নিচ্ছে, তা নিয়ে এখন আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। ৫ আগস্টের পর যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন যুগের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোন পথে এগোচ্ছে, তা এখন বড় জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বাংলাদেশিদের কাছেই এখন এক অচেনা দেশে পরিণত হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ

আপলোডের সময় : 11:19:42 am, Thursday, 1 October 2026

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বরাবরই জটিল ও আঁকাবাঁকা। সরল অংকের মতো মনে হলেও রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানো কার্যত দুরূহ। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার পথ কখনোই এমন অনিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল না, যা আজ ৫৫ বছর পর আমাদের দেখতে হচ্ছে। রাজনীতির এই ধারা যখন জনমুখী হওয়ার কথা ছিল, তখন যেন উল্টো পথেই হাঁটছে দেশ। অথচ ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের কল্যাণ ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক উত্তাল ও নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দলটির টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে এই পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের গণতন্ত্রের চিত্র কতটা বদলেছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ে গণতন্ত্রের পরিবর্তে বরং এক নতুন ধরনের ‘মবোক্র্যাসি’ বা জনতা-শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা ৫৫ বছরের ইতিহাসে এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। হাসিনা সরকারের পতনের পর মনে করা হয়েছিল, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালনা করতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হওয়ায় তারা সে পথে হাঁটেনি। মবোক্র্যাসিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ। এর ফলে মবোক্র্যাসি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলে। নির্বাচিত সরকার আসার পর মবোক্র্যাসি অনেকটাই কমে গেছে। তবে গণতন্ত্র এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পালাবদলের পরেও দেশের শাসনব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নানা উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশেষভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেখানে পুলিশের জনবান্ধব ও সেবামূলক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব পালনের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর আজও সাধারণ মানুষকে নিজেদের মত প্রকাশের জন্য পুলিশের গুলির শিকার হতে হচ্ছে—এই বাস্তবতা দেশের জন্য এক গভীর সংকট নির্দেশ করে। রাজনীতির এই অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতাময় পথ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে। যখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়ার কথা জনকল্যাণ, সেখানে রাজনীতির গতিপথ কেন বারবার ভুল দিকে মোড় নিচ্ছে, তা নিয়ে এখন আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। ৫ আগস্টের পর যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন যুগের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোন পথে এগোচ্ছে, তা এখন বড় জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বাংলাদেশিদের কাছেই এখন এক অচেনা দেশে পরিণত হয়েছে।