
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার ঐতিহাসিক নৌপথটি দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সচল হয়েছে। আসামের চা-নগরী ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। সোমবার বগীবিল থেকে এই নৌযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। ভার্চুয়াল মাধ্যমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও যুক্ত ছিলেন। ডিব্রুগড় থেকে পণ্যবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে রওনা হওয়ার এই ঘটনাকে এক তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতার মাধ্যমে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নৌপথ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর এর গুরুত্ব কমতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে এটি বন্ধ হয়ে যায়। ডিব্রুগড় বন্দরে স্টিমার চলাচলের সেই পুরোনো গৌরব হারিয়ে যায় ১৯৫৬ সালের দিকে। ডিব্রুগড়ে বেড়ে ওঠা সর্বানন্দ সনোয়াল স্মৃতিচারণ করে বলেন, দীর্ঘ ৭০ বছর আগে যে স্টিমারের বাঁশি এবং জাহাজের আনাগোনা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, আজ তা আবার ফিরে এসেছে। এই উদ্যোগকে ব্রহ্মপুত্র নদকে পণ্য পরিবহনের একটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে গড়ে তোলার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ, হয়ে যাওয়া এই নৌপথটি ১৯৪৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র বন্দর বন্ধ হয় ১৯৫৬ সালে। ডিব্রুগড়ে বেড়ে ওঠা সনোয়াল বলেন, আমাদের দাদা-দাদিরা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছেন। সনোয়াল বলেন, ভারতের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে মহান নদীবন্দর হিসেবে গৌরব অর্জন করেছিল, তা আবার ফিরে পাচ্ছে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮৫৬ সাল থেকেই কলকাতা থেকে নিয়মিত সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে যাতায়াত করত। ১৮৮২ সালে ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে চালু হওয়ার পর ১৯১৩ সাল নাগাদ ব্রহ্মপুত্র নদে স্টিমার যোগাযোগ অত্যন্ত জমজমাট ছিল। তবে ১৯৫০ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে নদীর তলদেশ ও গতিপথ পরিবর্তিত হলে পণ্য বুকিং বাধাগ্রস্ত হয় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর বন্দরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়। এরপর ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তঃসীমান্ত নৌবাণিজ্য সম্পূর্ণ থমকে যায়। দীর্ঘ সময় পর ১৯৭২ সালে দুই দেশ বাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষর করলেও নিয়মিত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি আসতে কয়েক দশক লেগে যায়। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হলো এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা।
সম্প্রতি বগীবিল ও ধুবড়িতে আধুনিক কাস্টমস ও অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় মিথানল পাঠানোর এই প্রক্রিয়াটি সহজ হয়েছে। এর আগে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পান্ডু থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত জলপথের ব্যবহার ফের শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছে এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ প্রমোদতরি বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় ভ্রমণ করে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।
ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথে পণ্য পরিবহনের হার ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে ভারত। প্রকল্পগুলোর মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামতের আধুনিক সুবিধা এবং বন্দরের সাথে শেষ মাইলের যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম। সর্বানন্দ সনোয়াল জানান, নদীপথে পণ্য পরিবহন জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং এর ফলে মহাসড়কের ওপর ট্রাকের চাপ কমবে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সাথে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ গড়ে তুলতে ভারত নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। এই পুরো যাত্রায় ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস ও কোচিন বাঙ্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের অংশীদাররা যুক্ত রয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 
























