
দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এক উদ্বেগজনক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে গুটিকয়েক মানুষের অস্বাভাবিক বিত্তবৈভব সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ১৮ মাসে দেশে নতুন করে ১২ হাজারের বেশি মানুষ কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। অথচ দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন এবং বর্তমানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিসংখ্যানের এই অস্থিরতা যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়, তবে তা অতীতের যেকোনো অস্থিতিশীল সময়ের মতোই বড় ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে। দুর্ভিক্ষ নয়, একদিকে অভাব-অনটন; আরেকদিকে গত মাস কয়েকে কিছু লোকের অকল্পনীয় বিত্তবৈভবের ক্ষোভে ফুঁসছে বাংলাদেশ। এর জেরে বিস্ফোরণটা কখন, কীভাবে ঘটবে—সেই অপেক্ষা উৎসাহী মহলে। তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রাসাদকে উত্তপ্ত করে না, ক্ষমতার করিডোরে হাঁটে না। পরিসংখ্যান ছাড়া দেখা না যাওয়া এ বারুদ সময়দৃষ্টে আরও কিছুর রসায়নে অঘটন ঘটায় ৮২, ৯০, ২০০৭ বা ২০২৪ এর মতো। চতুর মহল তাই চলমানে ঘুরতে থাকা বারুদটির বিস্ফোরণ চায়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপির পক্ষ থেকে দলের নেতাকর্মীদের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় এমপি ও নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে অচিরেই ‘স্বৈরাচার’ এবং বিভিন্ন অপশক্তি বা ‘গুপ্ত’ গোষ্ঠী জোটবদ্ধ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের এই বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির প্রধান টার্গেট হলো সেনাবাহিনীসহ দেশের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এবং এগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মাঝে মূল্যস্ফীতির সাইলেন্ট বারুদ।
পরিকল্পিত এসব ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আওতায় চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহতের যে দাবি করা হচ্ছে, তাকে পুঁজি করে বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচার গুলিবর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগও আনা হয়েছে। অথচ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী যখন চরম অস্থিরতার মধ্যেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে, তখন বিশ্বজুড়েই এর প্রশংসা হয়েছে। একইভাবে সীমান্ত হত্যা রোধ, মাদক ও মানবপাচার দমন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবির সাম্প্রতিক সাহসী ভূমিকা জনমনে বিশেষ আস্থা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো মব সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে সরকারবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তারা শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদের’ সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একইসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা বা গুপ্তচরদের যোগাযোগের কিছু তথ্যও গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। সব মিলিয়ে, দেশের স্থিতিশীলতাকে অস্থিতিশীল করতে বাহিনীগুলোর প্রধানদের জড়িয়ে একটি সুপরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি, যা বর্তমানে দলের মূল লক্ষ্য হলেও এখন রাষ্ট্রবিরোধী এই গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করাকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে দৃশ্যত আওয়াজ নেই, ভেতরে ভেতরে চলছে ফোঁসফাঁস।
প্রতিনিধির নাম 
























