দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির নেপথ্যে

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চায়ের দোকান, মসজিদ কিংবা নিজ বাসভবন—কোথাও নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষ। প্রায়ই মোটরসাইকেলে হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তরা এসে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, অপরাধীদের হাতের এই অবৈধ অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসছে এবং কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগুলো নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে? কখনো চায়ের দোকানের সামনে, কখনো মসজিদের পাশে, আবার কখনো নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক গুলি করে হত্যা।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় প্রভাব খাটানো, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতাগুলো ঘটছে।

এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকে’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। শুধু অস্ত্র নয়, একই সময়ে লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি উদ্ধার হয়নি। ফলে লুট হওয়া একটি অস্ত্র কতবার হাতবদল হয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, এখনও ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করা বাকি রয়ে গেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, এই লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামে পুলিশের দিকে ছোড়া গুলি এবং ঢাকার মিরপুরে উদ্ধার হওয়া একটি বিদেশি পিস্তল পরীক্ষা করে তা থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব অস্ত্রের সবই যে অপরাধীদের হাতে রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। অস্ত্রের সন্ধানদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

দেশব্যাপী সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় গুলি করে হত্যা করা হয় পিয়ারুল সরদারকে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ ১৩টি মামলা ছিল। একই দিন গভীর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারেক হোসেন বাপ্পি নামে এক যুবক নিহত হন। এ সময় তাফসির আলম শাওন নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অলিনগর এলাকায় অতর্কিত হামলায় তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। বুকে গুলিবিদ্ধ পিয়ারুলকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর এক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, খুলনার দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

খুলনায় অস্ত্রধারীদের তাণ্ডব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গত ৫ অক্টোবর রূপসায় আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর প্রায় ৫০ দিন আগে তাঁর ছেলে জয় ঢালীকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল। ছেলের হত্যা মামলার বাদী পিতাকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও গত ১৭ অক্টোবর খুলনা নগরীর পশ্চিম টুটপড়ায় শেখ জুম্মান রহমান বিশাল নামে এক যুবককে গুলি করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিপক্ষের কেউ কেউ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।’।

রাজধানীতেও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনা থামছে না। গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশীনগরে সেলুনে ফরহাদ হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১২ জুন রামপুরা-হাতিরঝিল এলাকায় সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কাওরান বাজারেও একইভাবে একজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসেই ৮৮১টি মামলা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজারে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে। বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের আরেকটি বড় উৎস সীমান্তপথ। চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়মিত দেশের অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সক্রিয় রুটগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং এই কাজে এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি রুট সক্রিয় এবং কোন পথে কী পরিমাণ অস্ত্র প্রবেশ করছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এছাড়া রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম ও তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসআরবির পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীর মতে, সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলমান আছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’।

তবে পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ঢাকা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেন, আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় অবস্থান মজবুত করার প্রবণতা থেকে বিরোধ বাড়ছে। তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেছেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। পুলিশের সাবেক আইজিপি বাহারুল আলও মনে করেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা বর্তমানে অনেক কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীদের কাছে থাকা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উদ্ধারে বিদ্যমান প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির নেপথ্যে

আপলোডের সময় : 11:21:08 am, Friday, 23 October 2026

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চায়ের দোকান, মসজিদ কিংবা নিজ বাসভবন—কোথাও নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষ। প্রায়ই মোটরসাইকেলে হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তরা এসে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, অপরাধীদের হাতের এই অবৈধ অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসছে এবং কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগুলো নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে? কখনো চায়ের দোকানের সামনে, কখনো মসজিদের পাশে, আবার কখনো নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক গুলি করে হত্যা।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় প্রভাব খাটানো, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতাগুলো ঘটছে।

এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকে’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। শুধু অস্ত্র নয়, একই সময়ে লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি উদ্ধার হয়নি। ফলে লুট হওয়া একটি অস্ত্র কতবার হাতবদল হয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, এখনও ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করা বাকি রয়ে গেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, এই লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামে পুলিশের দিকে ছোড়া গুলি এবং ঢাকার মিরপুরে উদ্ধার হওয়া একটি বিদেশি পিস্তল পরীক্ষা করে তা থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব অস্ত্রের সবই যে অপরাধীদের হাতে রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। অস্ত্রের সন্ধানদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

দেশব্যাপী সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় গুলি করে হত্যা করা হয় পিয়ারুল সরদারকে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ ১৩টি মামলা ছিল। একই দিন গভীর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারেক হোসেন বাপ্পি নামে এক যুবক নিহত হন। এ সময় তাফসির আলম শাওন নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অলিনগর এলাকায় অতর্কিত হামলায় তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। বুকে গুলিবিদ্ধ পিয়ারুলকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর এক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, খুলনার দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

খুলনায় অস্ত্রধারীদের তাণ্ডব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গত ৫ অক্টোবর রূপসায় আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর প্রায় ৫০ দিন আগে তাঁর ছেলে জয় ঢালীকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল। ছেলের হত্যা মামলার বাদী পিতাকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও গত ১৭ অক্টোবর খুলনা নগরীর পশ্চিম টুটপড়ায় শেখ জুম্মান রহমান বিশাল নামে এক যুবককে গুলি করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিপক্ষের কেউ কেউ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।’।

রাজধানীতেও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনা থামছে না। গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশীনগরে সেলুনে ফরহাদ হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১২ জুন রামপুরা-হাতিরঝিল এলাকায় সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কাওরান বাজারেও একইভাবে একজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসেই ৮৮১টি মামলা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজারে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে। বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের আরেকটি বড় উৎস সীমান্তপথ। চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়মিত দেশের অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সক্রিয় রুটগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং এই কাজে এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি রুট সক্রিয় এবং কোন পথে কী পরিমাণ অস্ত্র প্রবেশ করছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এছাড়া রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম ও তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসআরবির পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীর মতে, সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলমান আছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’।

তবে পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ঢাকা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেন, আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় অবস্থান মজবুত করার প্রবণতা থেকে বিরোধ বাড়ছে। তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেছেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। পুলিশের সাবেক আইজিপি বাহারুল আলও মনে করেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা বর্তমানে অনেক কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীদের কাছে থাকা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উদ্ধারে বিদ্যমান প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন।